জাতির উদ্দেশ্যে শেষ ভাষণে যা বলেন ইমরান (ভিডিও)

103

ইমরান খানের বিরুদ্ধে তোলা অনাস্থা প্রস্তাব নাকচ ও প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে সর্বোচ্চ আদালত রায়ের পর গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার ও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া সেই ভাষণে ইমরান খান বলেন, আমি প্রথম থেকেই চাইতাম, সবাই এই বিষয়টি জানুক আসলে কী হয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের আলোচনা হয়েছে। তারা বলেছে, ইমরান খানের রাশিয়া সফরে যাওয়া উচিৎ হয়নি।

ইমরান খান ভোটাভুটি থেকে বেঁচে গেলে পাকিস্তানকে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে। মানে প্রধানমন্ত্রী সরে না গেলে পাকিস্তান নাকি সমস্যায় পড়বে!

তারা আরও বলেছে, ইমরান খান হেরে গেলে পাকিস্তানকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। মানে ইমরান খানকে হটাতেই হবে। কারণ ইমরান সরে গেলেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সফল হবে।

বিদেশি শক্তি হুকুম দিচ্ছে পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। সেনা বাহিনীকেও হুকুম দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বলা হচ্ছে ইমরান খান সরে গেলে মাফ করে দেওয়া হবে। দেশের ২২ কোটি জনগোষ্ঠীর জন্য বিশাল এক কষ্টের বিষয় এটি।

পাকিস্তানিদের কাছে প্রশ্ন, যদি এভাবে আমাদের গোলামি করতে হয়, তাহলে আমরা স্বাধীন হয়েছি কেন? আমরা কেমন পাকিস্তান চাই? স্বাধীন-সার্বভৌম পাকিস্তান নাকি এরকম গোলামির পাকিস্তান?

পাকিস্তান নিয়ে শাহবাজ শরিফের বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের ঋণ বেশি হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন ভিক্ষুক। তাই ভিক্ষুক কখনও পছন্দ করার অধিকার রাখে না।

আরেক মন্ত্রী বলেছিলেন, আমরা লাইফ সাপোর্টে আছি। যুক্তরাষ্ট্র যখন চাইলেই লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ পাকিস্তানতো সত্যিকারের গোলাম।

আমার প্রশ্ন, গত তিন দশক ধরে নওয়াজ শরিফ ও ভুট্টো পরিবার ক্ষমতায় ছিল। দেশের এই অবস্থা কে করলো? গত ৩ বছরের ক্ষমতাকালে এমনটা কিন্তু হয়নি।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের ওপর ঋণের বোঝার জন্য নাকি গোলামি করতে হবে! তাহলে ইমরান খানকে সরাতে হবে কেন? আমার অপরাধ কি? আমার অপরাধ হলো, পাকিস্তানের ভেতর ড্রোন হামলা বন্ধ করতে বলা, ইরাক যুদ্ধের বিপক্ষে থাকা, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিপক্ষে থাকা।

নওয়াজ শরিফ ও ভুট্টো পরিবার এখন বলছে, ভিক্ষুকদের পছন্দ করার অধিকার নেই। অথচ যুক্তরাষ্ট্র যখন পাকিস্তানের ভেতর ৪০০ ড্রোন হামলা করেছিল তখন তারা চুপ ছিল।

পাকিস্তানে ড্রোন হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করলেও পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী কখনো প্রতিবাদ করেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সুদীর্ঘ চার হাজার মাইল দূর থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, পাকিস্তানের ওপর বোমা হামলা করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালোই জানে, ইমরান খান কখনোই তাদের হাতের পুতুল হবে না। মূলত এ কারণেই ইমরান খানকে তারা সরাতে চাইছে। হরেক রকম নাটক সাজানো হচ্ছে কেবল এক ইমরান খানকে সরানোর জন্য।

কারও সঙ্গে আমাদের শত্রুতা বা যুদ্ধাবস্থা নেই। ২২ কোটি পাকিস্তানির স্বার্থের জন্য যেটা ভালো হবে আমি সেটাই করবো। বাকিদের স্বার্থ পরে দেখব। কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আমি দেশের মানুষকে অন্য দেশের জন্য কোরবানি দেবো না।

হাড্ডির মতো ডলারের জন্য পাকিস্তানের সরকারগুলো যুদ্ধে পাকিস্তানকে ঠেলে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাড্ডির জন্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন চলে যাওয়ার দুই বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

হাড্ডির বিনিময়ে আফগানিস্তানে পাকিস্তানকে কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রর কাছ থেকে ডলার খেয়ে তালেবানদের বিরুদ্ধেও লড়াই করেছে পাকিস্তান। তাহলে আমাদের চরিত্রটা কি?

২২ কোটি মানুষের পাকিস্তানে দারিদ্র্য তখনই নির্মূল হবে যখন আমরা শান্তিপূর্ণভাবে থাকব, কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবো না। শান্তি তখনই আসবে যখন অন্য কোনো দেশের ঘাঁটি এদেশে থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের এমন একজন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন যে বলবে, ভিক্ষুকদের পছন্দ করার অধিকার নেই। যে হাড্ডির জন্য কামড়াকামড়ি করবে যুক্তরাষ্ট্র তাকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানাবে।

আমি পাকিস্তানের যুবকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব এখন আপনাদের হাতে।

বিদেশি কোনো শক্তি বা পক্ষ কখনোই একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে না। নিজেদেরই সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয়। আজ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে আপনারা (যুবসমাজ) এগিয়ে না এলে সামনে যে সরকারই ক্ষমতায় আসবে তারাই যুক্তরাষ্ট্রের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকেই তারা এমনটা করবে। ভিক্ষুকের কোনো পছন্দ নেই- এমন চিন্তা-ধারার লোকদেরই ক্ষমতায় বসাবে যুক্তরাষ্ট্র।

ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন, পাকিস্তান কি টিস্যু পেপার যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করার পর ছুড়ে ফেলে দেবে? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমি কখনোও একতরফা সম্পর্ক চাই না। আমি এমন সম্পর্ক চাই যাতে দুই পক্ষেরই লাভ থাকবে। আমি বিদেশি শক্তির সরকার কখনোই মেনে নেবো না।

আমি জনগণের কাছে যাবো। আমার পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না, আমি যতটুকু এসেছি জনগণের ভালোবাসায়। আল্লাহর রহমতে ধীরে ধীরে আমি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হতে পেরেছি মানুষের ভালোবাসায়।