হরিরামপুরে হার না মানা প্রতিবন্ধী পাখি রানী সাহার সংগ্রামী জীবন

হরিরামপুরে হার না মানা প্রতিবন্ধী পাখি রানী সাহার সংগ্রামী জীবন
হরিরামপুরে হার না মানা প্রতিবন্ধী পাখি রানী সাহার সংগ্রামী জীবন

জ. ই. আকাশ, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) থেকে : মাতৃগর্ভ থেকেই দুই পা বিকলাঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন পাখি রানী সাহা। প্রায় ৬০ বছরের জীবদ্দশায় বিকলাঙ্গ পা নিয়েই জীবনের সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন অসহায় প্রতিবন্ধী এই নারী। তিনি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বলড়া ইউনিয়নের পিপুলিয়া সোনার গ্রামের মৃত বিদু ভূষন সাহার বড় মেয়ে।

জানা যায়, দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে পাখি রানীই সবার বড়। একমাত্র ভাই বিনয় সাহা তিনি স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকেন মানিকগঞ্জ শহরে। ছোট বোন প্রতিমা রাণী সাহা। তার বিয়ে হয়েছে সাটুরিয়া। জন্মগতভাবে দুই পা বিকলাঙ্গ হওয়ায় বিয়ের পিড়িতে বসার সৌভাগ্য হয়নি পাখি রাণীর।

১৯৭৮ সালে তৎকালিন সময়ে নাম করণ করা  বলড়া আদর্শ বিদ্যা নিকেতন থেকে এসএসসি পাশ করেন পাখি রানী সাহা। তারপর আর পড়াশোনা ভাগ্যে জোটেনি তার। সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমান তিনি সেলাইয়ের কাজ করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে চলছেন। প্রায় ত্রিশ বছর আগে বিদেশী একটি স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা থেকে এই সেলাই মেশিনটি পান তিনি। পিপুলিয়া গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম থেকেও মহিলারা কাপড় চোপড় বানাতে আসেন পাখি রানীর কাছে। আবার রিক্সায় চড়ে তিনি বিভিন্ন গ্রামে বানানো কাপড়গুলো ডেলিভারিও দিয়ে আসেন। পাশাপাশি তিনি রেডিমেট থ্রি পিচও বিক্রি করেন। তবে টাকার অভাবে এতে তেমন সুবিধা করতে পারছেন না পাখি। প্রতিবন্ধী ভাতা চালু হলে ২০০৯ সালে তিনি পান প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড।
প্রায় ২০ বছর আগে মারা যান পাখির মা চিরা রাণী সাহা। বছর পাচেক আগে বাবা বিদু ভূষণের পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে পুরোপুরি এতিম হয়ে পড়েন এই প্রতিবন্ধী পাখি রানী সাহা।

সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,
বিশাল একটি বাড়ি। বাড়ির মাঝখানেই পুরানো জরাজীর্ন একটি ঘর। মা বাবার রেখে যাওয়া এই ঘরে একাই বসবাস করেন প্রায় ৬০ বছর বয়সী অসহায় প্রতিবন্ধী পাখি রাণী সাহা। এলাকার সবাই তাকে পাখি নামেই ডাকে। এই প্রতিবন্ধী পাখির উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন একটি হাত সেলাই মেশিন। এই সেলাই মেশিনের আয়েই চলে তার একক অসহায় সংসার জীবন।

পাখি রানীর বাড়িতে গেলে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানান, “সৃষ্টিকর্তার ওপর কারো হাত নেই। তিনি যেটা ভাল মনে করেন সেটাই সর্বশ্রেষ্ঠ। বাবা মা পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পরেই এই বাড়িতে একাই আছি। সেলাইয়ের কাজ করে নিজের রোজগার নিজেই করে খাই। সেলাইলের কাজের পাশাপাশি কিছু থ্রীপিচ কিনে বিক্রি করি। কিন্তু টাকার অভাবে বেশি মাল কিনতে পারি না। এভাবেই কোনোরকমে জীবনটা কেটে যাচ্ছে আর কি।”

তার বাড়িতে গেলে ছুটে আসেন আশেপাশের অনেক প্রতিবেশিরাও। সত্তরোর্ধ বয়স্ক প্রতিবেশী মন্টু সাহা জানান, “পাখির জীবনটাই আসলে অনেক কষ্টের একে তো দুটি পা-ই বিকলাঙ্গ।  অন্য দিকে এতিম অসহায়। সেলাইয়ের কাজই কোনোরকমে জীবন অতিবাহিত করছে।”

তবে জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানান প্রতিবন্ধী পাখি রানী সাহাসহ এলাকাবাসীর অনেকে।