হরিরামপুরে নতুন করে পদ্মার ভাঙন, আতংকে শত শত পরিবার

165
হরিরামপুরে নতুন করে দিয়েছে পদ্মার ভাঙন, আতংকে শত শত পরিবার
হরিরামপুরে নতুন করে দিয়েছে পদ্মার ভাঙন, আতংকে শত শত পরিবার

হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) থেকে : পদ্মার ভাঙনে দিশেহারা হরিরামপুরের পদ্মা তীরবর্তী কাঞ্চনপুর, গোপীনথপুর, রামকৃষ্ণপুর, বয়ড়া, হারুকান্দি ও ধূলশুড়া এই ৬টি ইউনিয়নের জনগণ। চলতি বর্ষা মৌসুমের প্রাক্কালে নদীতে নতুন পানি আসতেই দেখা দিয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। আতংকে রয়েছে শতশত পরিবার।

উপজেলার হারুকান্দি ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নে সমতল ভূমি, বসত বাড়ি, গাছপালা, ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে প্রতিদিনই। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ রাস্তাঘাটও পড়েছে হুমকির মুখে।

জানা যায়, হারুকান্দি ইউনিয়নে প্রায় ১৫/২০ দিন ধরে নতুন পানির প্রভাবে ভাঙন দেখা দিয়েছে ইউনিয়নের হারুকান্দি, চরকান্দি ও ব্রাহ্মণপাড়ার শেষ অব্দি পর্যন্ত। এতে করে প্রায় প্রতিদিন ২/৩ শো মিটার সমতল ভূমিসহ ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ ইউনিয়নে বর্তমানে ঝুঁকির মধ্য রয়েছে, ২০১৫ সালে স্থাপিত আব্দুর কাদের শিকদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গরীবপুর কমিউনিটি ক্লিনিক, গরীবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প, মির্জানগর বসের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলিয়ানগর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৪/৫টি মসজিদসহ বেশ কিছু বসত ভিটে বাড়ি এবং ফসলি জমি।

গত ৩১ মে সরেজমিনে গেলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আরও জানা যায়, গত ২০১৬/১৭ অর্থ বছরে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড হারুকান্দি ইউনিয়নের ব্রাহ্মণকান্দা হতে বয়ড়া ও রামকৃষ্ণপুর ইউনয়নের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৮.৮ কি. মি. জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ী বেরিবাঁধ নিমাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের বন্যাসহ অব্যহত ভাঙনের ফলে সেই অস্থায়ী জিও ব্যাগের ৮.৮ কি.মি বাঁধের মধ্যে হারুকান্দি ইউনিয়নের ৪ কি.মি. জিও ব্যাগের বাঁধ ভেদ করে প্রায় ১কি.মি. প্রস্থ সমতল ভূমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যা এখনও অব্যহত রয়েছে। একাধিক এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিনই নদী তীরবর্তী স্থান থেকে একাধিক ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে এ ইউনিয়নটি বর্ষার পানি আসতে না আসতেই ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।

হারুকান্দি ইউনিয়নের হারুকান্দি গ্রামের ইদ্রিস মাতব্বর জানান, “আমরা প্রতি বছরই নতুন নতুন ভাঙনের শিকার হইতেছি। এ পর্যন্ত আমার ফসলি জমি ও বসত ভিটাসহ ১৫/২০ একর জমি নদীতে চইল্যা গেছে।”

ব্রাহ্মণকান্দা গ্রামের বাসিন্দা ও বর্তমান ইউপি সদস্য ইদ্রিস মোল্লা দাবি করে বলেন, “আমার বাপদাদার এ পর্যন্ত ২০/২৫ থেকে একর জমি গাঙ্গে চইল্যা গেছে। বর্তমান আমার বাড়িটি এই ইউনিয়নের মৌজায় নাই। অন্য মৌজায় কোনো রকম ঠাই নিয়া আছি। এই ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা করা না হইলে হারুকান্দি ইউনিয়নই খুব তাড়াতাড়ি বিলীন হইয়া যাইব।”

হারুকান্দি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান চুন্নু বলেন, “আমি চেয়ারম্যান থাকাকালীন অবস্থায় মাননীয় সাংসদ মমতাজ বেগম ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এড. গোলাম মহীউদ্দীন হারুকান্দি ইউনিয়নের শুরু থেকে বয়ড়া ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মাঝামাঝি প্রায় ৮. ৮ কি. মি. জিও ব্যাগ ফেলে একটা অস্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে আমার ইউনিয়নে ফেলা সেই জিও ব্যাগ ভেদ করে প্রায় ১কি.মি. ভেঙে জিও ব্যাগসহ নদী গর্ভে চলে যায়। এবার বর্ষার জোয়ার পানি আসা শুরু হতেই নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ভাঙনের অন্যতম একটি কারণ হলো, আমার ইউনিয়নের এরিয়াসহ পদ্মা তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে করে পানির স্রোতের বেগটা তীরে এসে আঘাত করছে। প্রতিদিন এখানে একই স্থানে ৫/৬টা ড্রেজার সমানতালে বালু উত্তোলন করছে। পদ্মাবর্তী ৬টি ইউনিয়নকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে হলে এই অপরিকল্পিত অবৈধ বালু উত্তোলন রোধসহ স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে আমি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করছি, নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে এই অবৈধভাবে বালি উত্তোলন রোধসহ পদ্মা ভাঙনরোধ কল্পে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ।”

অপর দিকে জানা যায়, উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কোটকান্দি হতে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত দেখা দিয়েছে নতুন করে ভাঙন আতংক। গত ৭ দিনের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ১০০ বিঘা ফসলি জমি, ১টি বসতবাড়ি ও ২টি কলার বাগান। এছাড়াও হুমকির মুখে রয়েছে হুগলাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ মাদরাসাসহ পাটুরিয়া ঘাট থেকে আসা বাইপাস বাল্লা- কাঞ্চনপুর- গোপীনাথপুর- ঝিটকা সড়কটিও।

এ ব্যাপারে কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী বনি ইসলাম রূপক জানান, “নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলেই ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে আমার ইউনিয়নে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয় হয়েছে। গত বছর ৮০০ মিটার জিও ব্যাগ ফেলানো স্থানের মধ্যে ৪০০ মিটার এরিয়াই জিও ব্যাগসহ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মূলত শুকনো মৌসুমে স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করা না হলে সিম্পল জিও ব্যাগে এই ভাঙন রোধ সম্ভব হবে না বলে আমি মনে করি।”

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইন উদ্দিন জানান,, ২ জুন বৃহস্পতিবার পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মহোদয় মানিকগঞ্জ আসবেন। ভাঙনের তাকে সরাসরি অবহিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও তিনি হারুকান্দি ও গোপীনাথপুর উজানপাড়া এলাকার জন্য এডিবির ৩০ কোটি টাকার একটা প্রকল্পের প্রক্রিয়া চলছে। হয়তো মাস তিনেক সময় লাগবে। এ প্রকল্প চূড়ান্ত হলে ভাঙনরোধে অনেকটাই কাজ হবে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে কোনো এলাকায় তীব্রভাঙন দেখা দিলে তা সাময়িকভাবে রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”