স্বাস্থ্যকথা : ভিটামিন সি

103

ভিটামিন সি সম্পর্কে কম বেশি আমরা সবাই জানি। ভিটামিন সি যার রাসায়নিক নাম- অ্যাসকরবিক অ্যাসিড। এটি এমন এক ধরণের ভিটামিন, যা প্রাকৃতিকভাবে বেশ কিছু খাবারে উপস্থিত থাকে। সবগুলো ভিটামিনের মধ্যে ভিটামিন সি এর স্বাতন্ত্র একটু বেশি, এটি খুবই ক্ষণস্থায়ী কিন্তু একটি অপরিহার্য এক খাদ্য উপাদান এবং এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভিটামিন সি প্রোটিনের বিপাকে সাহায্য করে। এটি সংযোজক টিস্যু বা পেশীর একটি অপরিহার্য উপাদান। তাই এ ভিটামিন পেশী তৈরির মাধ্যমে ক্ষত নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (antioxidant)। অক্সিডেশন (oxidation) নামক এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের শরীরে কিছু অণু (Free radical) তৈরি হয়, যা আমাদের শরীরের কোষের ক্ষতি সাধন করে। ফলে ত্বক এবং কোষের বার্ধক্যের আশংকাকে বাড়িয়ে দেয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (antioxidant) এই ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বাধা দেয় এবং আমাদের কোষগুলোকে অযাচিত ধ্বংস থেকে রক্ষা করে, আমাদের ত্বক সতেজ রাখে এবং আমাদের বয়স আড়াল করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফাংশন ছাড়াও, ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধে (Immune function) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, ভিটামিন সি ক্যান্সার, হার্টের রোগ (কার্ডিওভাসকুলার) এবং অন্যান্য রোগের বিকাশ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করতে সাহায্য করে। এছাড়াও খাদ্য পরিপাকের পর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু খনিজ পদার্থ যেমন লৌহ বা আয়রনের শোষণে সহায়তা করে, যা আমাদের রক্তস্বল্পতা থেকে মুক্তি দেয়। তাই ভিটামিন সি’কে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি ক্যান্সার: প্রতিরোধ এবং চিকিৎসাসহ হার্টের রোগ, বয়স-সম্পর্কিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ছানি, রক্তস্বল্পতা এবং সাধারণ সর্দি-জ্বরের চিকিৎসা করতে ব্যবহার করা হয়। অপর্যাপ্ত ভিটামিন সি গ্রহণের কারণে স্কার্ভি (মাড়ির রোগ), ক্লান্তি বা অলসতা, পেশীর দুর্বলতা জাতীয় সমস্যা দেখা যায়।

এই ভিটামিন সি এমন একটি ক্ষণস্থায়ী ভিটামিন, যাকে খুব সাবধানে হ্যান্ডলিং করতে হয়। এটি পানিতে দ্রবণীয়, তাপ, আলো সহ্য করতে পারে না। একে আবার বেশিদিন সংরক্ষণ করাও যায় না। রান্নার তাপমাত্রায় এটি নষ্ট হয়ে যায় এবং আমাদের শরীর এটি জমা রাখতে পারে না। তাই প্রতিদিন আমাদেরকে এই ভিটামিনটি খেতে হবে।

এ সাথে কোন খাবারে কি পরিমাণ ভিটামিন সি আছে, তা আমাদের জানা প্রয়োজন। যেহেতু রান্না করা খাবারে ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কি খেলে আমরা এর অভাবমুক্ত থাকতে পারব, তা আমাদের জানা প্রয়োজন। সৌভাগ্যবশত, ভিটামিন সি’র প্রধান উৎস হচ্ছে ফলমূল এবং শাকসবজি, যা সাধারণত আমরা কাঁচা খেয়ে থাকি। টক জাতীয় ফলে এটি প্রচুর পরিমাণে থাকে। অনেকেই মনে করেন লেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে, তাই সর্দি-জ্বর হলে, বা ক্ষত শুকানোর জন্য লেবুর রস খেয়ে থাকেন। লেবুর প্রধান উপাদান হচ্ছে সাইট্রিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন সি হচ্ছে অ্যাসকরবিক অ্যসিড। এটি লেবুতে কিছু পরিমাণে থাকলেও ভিটামিন সি’র প্রধান উৎস লেবু না। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খোঁজ করলে প্রথম দশটি খাবারের মধ্যে লেবুর নাম পাওয়া যাবে না। লেবুর তুলনায় কমলালেবুতে ভিটামিন সি এর পরিমাণ ৪ গুণ, কিন্তু কমলার স্বাদ কম টক। পেঁপে এবং স্ট্রবেরিতে কমলালেবুর চেয়ে বেশি ভিটামিন সি রয়েছে, তবে এগুলি আরও কম টক, কম অম্লীয়। আবার পাকা বেল, লাল মরিচ (ক্যাপ্সিকাম), যা মোটেও টক নয় এবং সামান্য মিষ্টি, তাতে কমলার চেয়ে প্রায় ৩ গুণ ভিটামিন সি থাকে (প্রতি ১ কাপে ১৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি)। ঝাল সবুজ বা লাল মরিচেও আছে আরও বেশি (একটা মরিচে ১০৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি)। সুতরাং খাবারের স্বাদের ওপর ভিত্তি করেই বলা যাবে না, কোন ফলে বেশি ভিটামিন সি আছে। সবচাইতে বেশি ভিটামিন সি আছে পেয়ারাতে। এক্ষেত্রে অন্তত আমরা ভাগ্যবান যে, পেয়ারা আমাদের দেশে সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে অল্পদামে পাওয়া যায়। অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে লাল এবং সবুজ মরিচ, কিউইফ্রুট, ব্রোকলি, স্ট্রবেরি, আনারস, জাম্বুরা, ফুলকপি, বাঁধাকপি।

প্রতি ১০০ গ্রাম দেশীয় ফলের মধ্যে পাকা আমে ৪১ মিলিগ্রাম, পাকা পেঁপেতে ৫৭ মিলিগ্রাম, কালোজাম ৬০ মিলিগ্রাম, কামরাঙা ৬১ মিলিগ্রাম, আমড়া ৯২ মিলিগ্রাম, পেয়ারায় ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে, লিচু, আনারস, বাঙি, জাম্বুরা ও আতাফলে ২০ মিলিগ্রাম থেকে ৪০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ভিটামিন সি’র চাহিদা ৯০ মিলিগ্রাম এবং মহিলার ৭৫ মিলিগ্রাম। দিনে পাঁচ ধরণের ফল এবং শাকসবজি খেলে অন্তত দৈনিক চাহিদা পূরণ করার মতো ২০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যেতে পারে।

যেহেতু ভিটামিন সি খাবারের একটি ক্ষণস্থায়ী উপাদান, তাই সঠিক পরিমাণে এটি পেতে হলে আমাদেরকে তুলনামূলকভাবে সতেজ শাকসবজি আর ফলমূল খেতে হবে। যেহেতু ভিটামিন সি পানিতে দ্রবণীয়, তাই ফল বা সবজি কাটার পর তা পানিতে ধোয়া হলে এর অনেকটাই পানির সাথে চলে যেতে পারে। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে মাঠে ঘাটে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ অনেক রকমের শাক লতাপাতা পাওয়া যায়, যা বাগান থেকে তুলেই সাথে সাথে রান্না করা হয়। তাই গ্রামাঞ্চলের মানুষের এটির অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে প্রক্রিয়াকরণের সময় বেশিরভাগ ভিটামিন-সিই নষ্ট হয়ে যায়। শাক-সবজি কুচি কুচি করে কেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে, তারপর ভালো করে কচলিয়ে ধোয়া হলে, সিদ্ধ করে পানি ঝরালে এবং পরে রান্না করলে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ভিটামিন সিই নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমাদের উচিৎ, কাটার আগে শাক-সবজি ধুয়ে নেয়া, সিদ্ধ করে পানি না ঝরানো। ভিটামিন সি তাপে ধ্বংস হয়, তাই শাক-সবজি অনেকক্ষণ সময় নিয়ে রান্না না করে অল্পসময়ে রান্না করতে হবে। তাপে (স্টিমিং) বা মাইক্রোওয়েভে রান্নার মাধ্যমেও ক্ষতি কমানো যেতে পারে। সঠিক উপায়ে খাবার তৈরি করে আমাদের শরীর আর ত্বককে সুস্থ এবং তারুণ্যময় রাখতে আমাদের এ ক্ষেত্রে যথাযথ জ্ঞান এবং সচেতনতা আবশ্যক। প্রয়োজন শুধু আমাদের ভিটামিন সি এর গুরুত্ব বোঝা।

লিখেছেন শরীফুন নাহার, ফ্রিল্যান্স রাইটার