পুলিশের গুলিতে নয়, বোমার আঘাতে সুরাইয়ার মৃত্যু!

273
মায়ের দাবি, পুলিশের গুলিতে কোলে থাকা মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ বলছে, চার রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছাড়া তারা অন্য কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। মায়ের চোখের সামনে ঘটনাটি ঘটলেও এখনও নিশ্চিতই হওয়া যায়নি, কীভাবে, কীসের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে শিশুটির।
মোবাইল ফোনে তোলা সেদিনের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সুরাইয়ার মাথার খুলি, রক্ত বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। একটি টিনের বেড়ার প্রায় আট ফুট উপরে পোস্টারেও রক্ত লেগেছে। ভিডিওটি কার করা তা জানা যায়নি। তাতে অনেককেই ‘বোমা মারা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করতে শোনা গেছে। ভিডিওতে একটি ধাতব খোসার মতো দেখা গেছে। স্থানীয়রা সেটিকে বোমা জাতীয় কিছু বলে দাবি করেছেন।

আনোয়ার হোসেন আকাশ, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি : মায়ের দাবি, পুলিশের গুলিতে কোলে থাকা মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ বলছে, চার রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছাড়া তারা অন্য কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। মায়ের চোখের সামনে ঘটনাটি ঘটলেও এখনও নিশ্চিতই হওয়া যায়নি, কীভাবে, কীসের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে শিশুটির।

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সহিংসতায় বীভৎসভাবে প্রাণ হারিয়েছে ৯ মাসের সুরাইয়া আক্তার আশা। ঘটনার ৬ দিনেও হয়নি কোনো হত্যা মামলা। নেই কোনো আটক। তাহলে শিশু সুরাইয়াকে মারলো কে? কীসের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে তা এখন পর্যন্ত ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে।

গত বুধবার (২৭ জুলাই) বিকেলে বাচোর ইউনিয়নের ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মেয়ে সুরাইয়াকে কোলে নিয়ে তার মা মিনারা আক্তার ভোট দিতে যান।

মিনারার ভাষ্য অনুযায়ী, ভোট দিয়ে ফেরার পথে তিনি স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সসময় কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা হলে পরাজিত মেম্বার প্রার্থীদের সমর্থকরা সংঘর্ষ বাধায় পুলিশের সঙ্গে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে।

এই সংঘর্ষের সময় মারা যায় ৯ মাসের শিশু সুরাইয়া। মাথার খুলি উড়ে যায় তার। ওই রাতেই মরদেহ নিয়ে রাস্তা অবরোধ, থানা ঘেরাওসহ পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষুদ্ধ জনতা।

স্থানীয় জনগণ ও আশার বাবা-মায়ের দাবি, শিশুটি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে।

ঘটনায় রাতেই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন যার প্রতিবেদন সাত কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেয়ার কথা রয়েছে। এর আগে হাসপাতালে সুরাইয়ার বাবা-মাকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।

ঘটনার রাতেই আশার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়। পরদিন ২৮ জুলাই দুপুরে মরদেহ হস্তান্তর করা হলে পরিবার জানাজা শেষে আশাকে দাফন করে।

এদিকে শোনা যাচ্ছে, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক নাকি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, পুলিশের গুলিতে নয়, আশার মৃত্যু হয়েছে কোনো ভোঁতা অস্ত্রের কোপে। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের বক্তব্য দেননি। প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না বলেও জানান।

৩১ জুলাই সারাদিন ঘটনাস্থল ঘুরে ও এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিহত শিশুর মা মিনারা একাধিক সংবাদমাধ্যমে ঘটনার একেকরকম বিবরণ দিয়েছেন। কোনোটিতে বলা হয়েছে, গুলি লাগার পর মিনারার কোল থেকে ছিটকে পড়ে আশা। আবার কোথাও বলা হয়েছে, ঘটনার সময় আশা তার মায়ের কোলে ছিল না।

৩১ জুলাই আবারও মিনারা আক্তারের সঙ্গে কথা বললে তিনি দাবি করেন, পুলিশের গুলিতেই তার কোলে মারা গেছে আশা যা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন।

মিনারা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, বেল মার্কেটের সামনে ভোটকেন্দ্রের বাইরে একটি বাসার সামনের রাস্তার ধারে তিনি সুরাইয়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখানে আরও কয়েজন নারী ছিলেন। তার পাশেই ছিলেন জাহানারা বেগম নামের এক পরিচিত নারী।

মিনারা বেগম জানান, তার চোখের সামনেই আশার মাথায় গুলি লেগে খুলি উড়ে যায়। মেয়ে সুরাইয়ার চিৎকারও শোনেন তিনি। এসময় সুরাইয়ার সারাদেহ রক্তে ভিজে যায়। এসময় তারও (মিনারার) দুই হাত রক্তে ভিজে যায়। তিনি অচেতন হয়ে গেলে সুরাইয়াকে কে বা কারা কোল থেকে নিয়ে যায় তা তিনি কিছু বলতে পারেন না। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে জ্ঞান ফেরে।

হাসপাতালে তোলা কিছু ছবিতে দেখা গেছে, মিনারার পোশাকে কোনো রক্তের দাগ নেই। ২৭ জুলাই ঘটনার দিন তিনি যে পোশাকে ছিলেন, ৩১ জুলাইও তার পরনে সেই একই পোশাক দেখা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিনারা জানান, ঘটনার দিন ভোটকেন্দ্রে তিনি এই জামা ও ওড়না পরেই ভোট দিতে গিয়েছিলেন। ঘরে ফিরে তিনি পোশাকটি ধুয়েছেন।

সুরাইয়া নিহত হওয়ার পর তার মা-বাবা দুজনই অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের ভর্তি করা হয় স্থানীয় একটি হাসপাতালে। সুরাইয়া নিহতের ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি মিনারা। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কথা বলে আর কিছু হবে না। উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টা দেখছেন।

সেদিন সংঘর্ষের ঘটনার সময় মিনারার পাশে থাকা জাহানারা বেগম বলেন, গুলি লাগতে আমি দেখিনি। সেসময় গুলির আওয়াজ শুনেছি। চারদিকে ধোঁয়া ছিল। আর আমার চোখসহ গোটা শরীর জ্বালাপোড়া করছিল। আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমি সামনে থাকা একটি খরের ঢিবিতে শুয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর উঠে দেখি আমার হাতের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত আর মগজের টুকরা লেগে আছে। আমি সেগুলো পরিষ্কার করতে পাশের বাড়িতে যাই।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় আইয়ুব আলী জানান, ঘটনার সময় মিনারা পুলিশের গাড়ির দিকে ছিলেন আর বিক্ষোভকারীরা সামনের দিকে ছিলেন। ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়ে মসজিদের সামনে রাস্তার উপর দাঁড়ানো ছিল একটি পুলিশের পিক-আপ, তার একটু সামনে পুলিশের একটি মাইক্রো দাঁড়ানো। গাড়ির একটু সামনে লাঠি হাতে দাঁড়ানো ছিল পরাজিত মেম্বার প্রার্থীর বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা।

আইয়ুব আলী বলেন, পুলিশের দিকে গাড়ির একটু পাশেই সুরাইয়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো ছিলেন তার মা। যখনই পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায় আমি বাড়ির ভেতরে চলে যাই এবং বাড়ির সদস্যদের মাটিতে শুয়ে পড়তে বলি। কারণ আমার বাড়ি থেকে গুলির আওয়াজ শুনেছি। ধারণা করছি, গুলিতে শিশুটির মাথার খুলি উড়ে যেতে পারে।

মোবাইল ফোনে তোলা সেদিনের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সুরাইয়ার মাথার খুলি, রক্ত বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। একটি টিনের বেড়ার প্রায় আট ফুট উপরে পোস্টারেও রক্ত লেগেছে। ভিডিওটি কার করা তা জানা যায়নি। তাতে অনেককেই ‘বোমা মারা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করতে শোনা গেছে। ভিডিওতে একটি ধাতব খোসার মতো দেখা গেছে। স্থানীয়রা সেটিকে বোমা জাতীয় কিছু বলে দাবি করেছেন।

তারা জানান, এদিন প্রায় দুই থেকে তিনশ গজ এলাকা জুড়ে পুলিশের টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় কিছু দেখা যায়নি। গুলির আওয়াজ শোনা গেছে কয়েকবার। ভোঁতা দা দিয়ে শিশুটির মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় কোপ দিলে তার মা মিনারা আক্তার অবশ্যই দেখতেন।

এদিকে পুলিশের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সেদিন রাবার বুলেট ছাড়া কোনো ভারি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি।

সন্তান হত্যায় মামলা কেন করছেন না জানতে চাইলে মিনারা বলেন, তাদের ভরসা উপজেলা চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আজম মুন্না। তিনি যেমন বলবেন তেমনটাই মেনে নেবেন বলে জানান নিহত সুরাইয়ার মা।

এ বিষয়ে রাণীশংকৈল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আজম মুন্না বলেন, এলাকার মানুষ যাতে বিশৃঙ্খলা না করে এবং তাদের জানমালের কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য শান্ত থাকতে বলেছি। আমি মামলার বিষয়ে পরিবারটির সঙ্গে কথা বলব।

অন্যদিকে ঘটনার পর থেকে গ্রামে দেখা যাচ্ছে না পরাজিত মেম্বার প্রার্থীদের বা তার সমর্থকদের। তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিহত সুরাইয়ার লাশ নিয়ে রাস্তা অবরোধ করা ও পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে এলাকাবাসীকে নিয়ে থানা ঘেরাও করা কথিত চাচা আবু বক্করের বাড়িতে গিয়ে তাকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় এখনও কোনো হত্যা মামলা হয়নি। রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা (ওসি) জাহিদ ইকবাল জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে।

সুরাইয়ার মরদেহের সুরহতালে কী ছিল জানতে চাইলে ওসি জানান, প্রতিবেদন তিনি দেখেননি।

রানীশংকৈলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইন্দ্রজিৎ শাহার উপস্থিতিতে সুরতহাল হয়েছে। তিনি বলেন, সুরাইয়ার শরীরে আর কোনো ক্ষত ছিল না। মাথার ডান পাশের অংশ উপড়ে গেছে, মগজ পাওয়া যায়নি।

ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মোহম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় জানমাল রক্ষায় পুলিশ চার রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়েছে। রাবার বুলেটে মাথার খুলি উড়ে যাওয়ার কথা নয়। ছোট ছোট ছিদ্র হওয়ার কথা। যেহেতু তদন্ত কমিটি হয়েছে, আমি মন্তব্য করতে চাই না।

এর আগে ঘটনার পরদিন তিনি বলেছিলেন, সারাদিন সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট চলেছে। ভোটের ফল ঘোষণা শেষে কেন্দ্র ত্যাগ করার সময় পরাজিত মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকরা আমাদের মোবাইল টিম ও সদর সার্কেলের ওপর হামলা করে। কিছু সময় পর পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে যায়। আমাদের সদস্যদের ওপর তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করে। এতে পরিবেশ আরও বেশি খারাপ হওয়ায় জান-মাল রক্ষায় পুলিশ ৪ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে।

সুরাইয়ার মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মাহাবুব রহমানও জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

এদিকে সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পুলিশের দুই সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) বাদী হয়ে তিনটি মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাতনামা ৬৫০ থেকে ৮০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।