মেয়েকে হারাবো জানলে ভোট দিতাম না : গুলিতে খুলি উড়ে নিহত আশার মা

143
মেয়েকে হারানোর কথা জানাতে গিয়ে বিলাপ করতে করতে মিনারা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে হারাতে হবে জানলে ভোট দিতে যেতাম না। আমি এর বিচার চাই।
মেয়েকে হারানোর কথা জানাতে গিয়ে বিলাপ করতে করতে মিনারা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে হারাতে হবে জানলে ভোট দিতে যেতাম না। আমি এর বিচার চাই।

আনোয়ার হোসেন আকাশ, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি : গুলির শব্দে আমিসহ আরও অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। মার্কেটের গলির সামনে আমার স্ত্রীর কাছে এসে দেখি আমার মেয়ের মাথার খুলি গুলিতে উড়ে গেছে। আমি সেখানেই অচেতন হয়ে পড়ি। কথাগুলো নির্বাচনী সহিংসতায় পুলিশের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে নিহত সুরাইয়া আক্তার আশার বাবার। আর মেয়েকে হারানোর কথা জানাতে গিয়ে বিলাপ করতে করতে মিনারা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে হারাতে হবে জানলে ভোট দিতে যেতাম না। আমি এর বিচার চাই।

ছোট্ট আশা ছিল বাড়ির মধ্যমণি। শিশুটি দুরন্তপনায় ঘর মাতিয়ে রাখত। বড় দুই ভাইবোনের কাছে ছিল খেলার জীবন্ত পুতুল। মা-বাবার ভাঙাচোরা ঘরের আলো ছিল সে। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের বাচোর ইউনিয়নের ফেরিওয়ালা মো. বাদশা ও মিনারা আক্তারের ছোট মেয়ে সুরাইয়া আক্তার আশা।

আশা বুধবার দুপুরেও খেলেছে ঘরে-আঙিনায়। বৃহস্পতিবার সেই ঘরে ফিরলো নিথর আশা। তার প্রাণ গেছে মায়ের কোলেই। সন্তানের মাথার খুলি উড়ে যাওয়ার মতো বীভৎস দৃশ্য বুধবার বিকেলে দেখতে হয়েছে মিনারা ও বাদশাকে।

আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে ছোট্ট আশার মরদেহ বৃহস্পতিবার হস্তান্তর করেছে পুলিশ। বাবার কাঁধে চড়ে নিজ গ্রাম মীরডাঙ্গী দিঘিরপাড়ে স্থানীয় কবরস্থানে চিরঘুম দিয়েছে আশা।

বাচোর ইউনিয়নে বুধবার ছিল ইউপির ভোট। বিকেলে ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফল ঘোষণার পর মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি করে পুলিশ। সে সময় কেন্দ্রের পাশে ভাংবাড়ি বেল মার্কেটের সামনে আশাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিনারা।

শিশুসন্তানের বীভৎস মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে আর্তনাদ করছিলেন মিনারা বেগম। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মিনারা বলতে থাকেন, ঘরের কাজ সেরে শেষ সময়ে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাই। আমার সঙ্গে আমার স্বামীও গিয়েছিলেন। দুজনে ভোট দিয়েছি। ভোট দিয়ে আমি কেন্দ্রের বাইরে বেল মার্কেটের একটি গলিতে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে সময় গেটের সামনে পুলিশের সঙ্গে গণ্ডগোল শুরু হয় লোকজনের। সবাই ছুটোছুটি করছিল, গুলির আওয়াজ শুনছিলাম। আমি বাচ্চা নিয়ে মার্কেটের গলিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম ভয়ে। আমার কোলের বাচ্চার মাথার খুলি গুলিতে উড়ে যায়।

আশার বাবা বলেন, ভোট দিয়ে কেন্দ্রের বাইরে কয়েকজন পরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। কিছুক্ষণ পর ফল ঘোষণা হয়। গেটের সামনে লোকজন পুলিশকে ইট-পাটকেল মারতে থাকে। পুলিশ দেখলাম তাদের পেটাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পুলিশ গুলি করে। গুলির শব্দে আমিসহ আরও অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। মার্কেটের গলির সামনে আমার স্ত্রীর কাছে এসে দেখি আমার মেয়ের মাথার খুলি গুলিতে উড়ে গেছে। আমি সেখানেই অচেতন হয়ে পড়ি। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই, আমার মেয়ে হত্যার অপরাধীদের বিচার চাই।

যে কারণে সংঘর্ষ :

ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয় জানার জন্য ভোটে জয়ী মেম্বার প্রার্থী বাবুল হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ফল পাওয়ার পর আমিসহ আমার সমর্থকরা উপজেলা সদরে চলে আসি। সেখানে এসেই জানতে পারি, আমার ফল না মানতে বিশৃঙ্খলা চলছে এবং গুলিতে একজন নিহত হয়েছে।

বাবুল হোসেন আরও বলেন, নির্বাচনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফুটবল মার্কার আজাদ আলী ও মোরগ মার্কার খালেদুর রহমান আমার জয় মেনে নিতে পারেননি। কারণ আমি দুইবার তাদের নির্বাচন করেছি (পক্ষে কাজ করেছি)। তারা দুজন দুইবার মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার আমি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি এবং জয়ী হই। তারা আমার প্রতি হিংসাত্মক ছিলেন। তাই তাদের লোকজন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।

যা বলছে পুলিশ :

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সারাদিন সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট চলেছে। ভোটের ফল ঘোষণা শেষে কেন্দ্র ত্যাগ করার সময় পরাজিত মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকরা আমাদের মোবাইল টিম ও সদর সার্কেলের ওপর হামলা করে।
কিছু সময় পর পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে যায়। আমাদের সদস্যদের ওপর তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা শুরু করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করে। এতে পরিবেশ আরও বেশি খারাপ হওয়ায় জান-মাল রক্ষায় পুলিশ ৪ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোঁড়ে।

শিশু আশার মরদেহ নিয়ে বুধবার রাতে থানা ঘেরাও করে স্থানীয়রা সংঘর্ষে পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন জানিয়ে এসপি বলেন, ঘটনার সময় শিশুটি মারা যায়। আসলে কীভাবে মারা গেল তা এখনও জানা যায়নি। এর জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের শটগান দিয়ে রাবার বুলেট ছুঁড়লে সাধারণত ছোট ছোট ছিদ্র হয়। যেহেতু তদন্ত কমিটি হয়েছে তারা তদন্ত করুক। তদন্ত প্রতিবেদন আসলে বোঝা যাবে। এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না। করা ঠিক হবে না।

রানীশংকৈল থানার ওসি এসএম জাহিদ ইকবাল জানান, আশার ময়নাতদন্ত হয়েছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রতিবেদন পেলেই মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।

পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বৃহস্পতিবার বিকেলে আশার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। এদিন আজাদ ও খালেদুরকে তাদের এলাকায় পাওয়া যায়নি। তাদের মোবাইল ফোনও ছিল বন্ধ।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মাহাবুব রহমান জানান, ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিবারটিকে দেয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।