মহামারিতে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা

108

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮১ তম প্রয়াণ দিবস ৬ আগস্ট। নোবেল বিজয়ী কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাঙালির অহংকার, তিনি বিশ্বকবি অর্থাৎ বিশ্বের কবি। বাংলা সাহিত্যে সর্বক্ষেত্রে রয়েছে তাঁর বিচরণ। যে কারণে তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিনটি বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ববহ। তিনি প্রথম বাঙালি কবি যিনি ১৯১৩ সালে নোবেল জয় করে বাঙালিকে গৌরবান্বিত করেছিলেন। তাঁকে আমরা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে গুরুদেব বলে মানি। তাই প্রতিবছর গুরুদেবের জন্ম- মৃত্যু দিনটি অত্যন্ত ঘটাকরে দুই বাংলার মানুষ উদযাপন করে থাকি।

কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক, দেশের জ্ঞানীগুণী বিদগ্ধজনেরা আলোচনা করেন গুরুদেবের জীবন, ও সৃষ্টশীল কর্মনিয়ে। বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী নাট্যজনেরা পরিবেশন করেন কবির কবিতা, সঙ্গীত ও মঞ্চস্থ হয় তাঁর নাটক। বাঙালির প্রাণে দোলাদেয় কবির সকল সৃষ্টিকর্ম। কিন্তু বিগত দুই বছর বিশেষ করে দুই বাংলার মানুষ কবির জন্মদিনটিকে যেভাবে উদযাপন করে থাকে সেভাবে করতে পারেনি কোভিড -১৯ এর কারণে। করোনা ভাইরাস নামক অদৃশ্য এক ভাইরাসের সাথে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে বিশ্বের মানুষকে । যুগে যুগে এ ধরণের মহামারি, অতিমারি পৃথিবীর মানুষকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে প্রতি একশ বছর পর পর মহামারি কাপিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর মানচিত্র। মানুষকে মোকাবেলা করতে হয়েছে এক একটা নতুন নতুন রোগ ব্যাধি। তবুও থেমে থাকেনি জীবন, থেমে থাকেনা মানুষ। পরিবেশ আর পরিস্থিতেকে সামলে নিয়েছে।

প্লেগ,কলেরা,গুটিবসন্ত, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা, স্প্যানিশ ফ্লু, এশিয়ান ফ্লু, সার্স মোকাবেলার পর বিশ্বের মানুষ ২০১৯ সাল থেকে মোকাবিলা করছে কোভিড-১৯ কে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মোকাবেলা করেছেন প্লেগ এর মতো ভয়ংকর মহামারিকে। জীবদ্দশায় তিনি ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত, প্লেগের মতো প্রাণঘাতি বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করেছেন। প্লেগ ঠেকাতে তিনি পথে নেমেছিলেন। ১৮৯৮ থেকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে প্লেগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিলো। জীবন বাঁচাতে মানুষ দলে দলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো। কোথায় গেলে বেঁচে থাকা যাবে সেই সন্ধানে। সংক্রমনের চেয়ে মৃত্য ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তখন মানুষকে। সে সময় অসহায় মানুষকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন প্লেগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য গড়ে তুলবেন প্লেগ হাসপাতাল। তাঁর এই সিদ্ধান্তের সাথে সঙ্গী হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভগিনী নিবেদিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভগিনী নিবেদিতা মহামারি থেকে মুক্তির জন্য একসঙ্গে নেমে পড়েছিলে পথে। রাত – দিন তাঁরা মানুষের সেবায়, কীভাবে মানুষকে ভালো রাখা যায় সেই চেষ্ঠায় করতে লাগলেন। এই প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর “ জোড়াসাঁকোর ধারে” গ্রন্থে লিখলেন- “ সেই সময়ে কলকাতায় লাগলো প্লেগ। চারদিকে মহামারি চলছে, ঘরে ঘরে লোক মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। রবিকাকা এবং আমরা এবাড়ির সবাই মিলে চাঁদা তুলে প্লেগ হাসপাতাল খুলেছি। চুন বিলি করছি। রবিকাকা ও সিস্টার নিবেদিতা পাড়ায় পাড়ায় ইন্সপেকশনে যেতেন, নার্স ডাক্তার রাখা হয়েছিলো”।

সেই মহামারিতে অগনিত মানুষ প্রাণ হারায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নয়- দশ বছরের শিশুকন্যাও রেহাই পাইনি মৃত্যুর হাত থেকে। সেই সময় তাঁরা প্রাণে বাঁচার জন্য চলে যায় চৌরঙ্গির একটি বাড়িতে। সেখানেই তিনি বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘শাহজাহানের মৃত্যু’ ছবিটি অংকন করেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই চিত্রকর্ম সম্পর্কে জানান-‘ মেয়ের মৃত্যুর যত বেদনা বুকেছিলো তার সব ঢেলে দিয়ে সেই ছবি আঁকলুম’।
শুধু প্লেগ নয় কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি ঠেকাতে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কলেরাতে ঠাকুরবাড়িতেও মৃত্য হানা দেয়। রবীন্দ্রপুত্র শমীন্দ্রনাথ কলেরা সংক্রামিত হয়ে মারা যায়। রবীন্দ্রনাথ ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়লেও বুঝলেন এ মহামারিতে আক্রান্ত মানুষকে, পীড়িত গ্রামকে বাঁচাতে শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়। ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের কাছে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত জনপদে নেমে পড়লেন তিনি। ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় গ্রামের মানুষকে করে তোলেন সাহসী। মৃত্যকে জয় করে মহামারি মোকাবেলা করার সাহস যেগাতে লাগলেন। সাথে সাথে নিজের প্রচেষ্ঠায় ঔষধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, দেশী বিদেশী ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়ে পল্লীতে পল্লীতে গড়ে তোলেন সেবাকেন্দ্র। এ সময় মানুষকে সাহসী ও বিশ্বাসী করতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হলেন দক্ষ জীবানু বিশেষজ্ঞ দ্য সেন্ট্রাল কো অপারেটিভ আ্যান্টি ম্যালেরিয়া সোসাইটির সেক্রেটারী গোপালচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আমেরিকা রফফেলার ফাউন্ডেশনের ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় পরিদর্শক ডাক্তার জে এফ কেন্ড্রিকও। যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহন করলেন। তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মী তৈরী করলেন তিনি। তাঁদের কাজ হলো গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সেবা প্রদান।

তারপর যখন ইনফ্লুয়েঞ্জা মারাত্মক আকার ধারণ করে সে সময় রবীন্দ্রনাথ পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হয়েছিলেন। এবার তিনি একেবারে কবিরাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। শান্তিনিকেতনে যাতে এই ফ্লু না ছড়াতে পারে তার জন্য তিনি আগেই প্রত্যেককে পঞ্চতিক্ত পাচন খাইয়েছিলেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথ মহামারিকে মোকাবেলা করেছেন। মহামারি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চমৎকার উপলব্দিকে প্রকাশ করেছেন ঠিক এভাবে- “ ম্যালেরিয়া, প্লেগ, দুর্ভিক্ষ কেবল উপলক্ষ মাত্র, তাহার বাহ্য লক্ষণমাত্র,মূল ব্যাধি দেশের মজ্জার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। আমরা এতদিন একভাবে চলিয়া আসিতেছিলাম আমাদের হাটে বাটে গ্রামে পল্লীতে আমরা একভাবে বাঁচিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলাম। আমাদের সে ব্যবস্থা বহুকালের পুরাতন। তাহার পরে বাহিরের সংঘাতে আমাদের অবস্থান্তর ঘটিয়াছে। এই নতুন অবস্থার সহিত এখনো আমরা সম্পূর্ণ আপস করিয়া লইতে পারি নাই, এক জায়গায় মিলাইয়া লইতে গিয়া আর এক জায়গায় অঘটন ঘটিতেছে। যদি এই নতুনের সহিত আমরা কোনদিন সামঞ্জস্য করিয়া লইতে না পারি তবে আমাদিগকে মরিতেই হইবে।“ কবিগুরুর ৮১ তম প্রয়াণ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে বলবো বর্তমান প্রেক্ষাপটে কবি গুরুর সেই সতর্কবাণী বর্তমান সময়ে একেবারে যেন চিরন্তন সকলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ এর হাত থেকে ভালো থাকতে হলে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনুধাবন করে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান অতীব জরুরী। পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলাটা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : তাপস মজুমদার, প্রভাষক, লেখক ও প্রাবন্ধিক