ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাটার বিরুদ্ধে প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ

171
মিরপুর ১০ নম্বর বাটার শোরুম থেকে এক জোড়া দামি জুতা কিনি। কয়েকদিন পরই দেখি দুটি জুতারই মাঝ বরাবর তলা ফাটা। নিশ্চিত হলাম, নতুন বলে আমাকে রিজেক্ট জুতা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মিরপুর ১০ নম্বর বাটার শোরুম থেকে এক জোড়া দামি জুতা কিনি। কয়েকদিন পরই দেখি দুটি জুতারই মাঝ বরাবর তলা ফাটা। নিশ্চিত হলাম, নতুন বলে আমাকে রিজেক্ট জুতা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সুদীর্ঘ ১২৮ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুনামের সঙ্গে জুতার ব্যবসা করে যাচ্ছে বাটা। কিন্তু ইদানীং স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে দেশে। ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে বাটা। এমনই এক ভুক্তভোগী ক্রেতা রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন গুরুতর অভিযোগ তুললেন বাটার বিরুদ্ধে।

বাটার প্রতারণার কথা জানাতে গিয়ে মো. জাকির হোসেন বলেন, সম্প্রতি মিরপুর ১০ নম্বরে বাটার শোরুম থেকে এক জোড়া দামি জুতা কিনি। প্রথম ১০-১২ দিন সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ একদিন দেখি জুতার তলা দিয়ে ছোট্ট একটি ইটের টুকরো ঢুকে পড়েছে। এই ঘটনায় ভীষণ অবাক হলাম। ভালোমতো জুতা চেক করে দেখলাম, দুটি জুতারই মাঝ বরাবর তলা ফাটা। এর মধ্য দিয়ে আমি নিশ্চিত হলাম যে, নতুন বলে আমাকে রিজেক্ট জুতা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মো. জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কমদামি জুতা হলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু এত দাম দিয়ে জুতা কিনে যদি ১৫ দিনও পরতে না পারি তাহলে সেটা তো মেনে নেওয়া যায় না।

মো. জাকির হোসেন আরও বলেন, মিরপুরের যে শোরুম থেকে কিনেছিলাম সেখানে জুতা নিয়ে গেলাম। জুতা কেনার রশিদ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তবে সৌভাগ্যক্রমে জুতার বাক্সটি ছিল। সেই বাক্সের গায়ে বারকোড সাঁটা ছিল।

শোরুম ম্যানেজারকে যখন বললাম, বারকোড থেকে তো জুতা তৈরির মুহূর্ত থেকে শুরু করে বিক্রি হওয়া পর্যন্ত সব তথ্যই বের করা সম্ভব। কিন্তু ম্যানেজার জানালেন, সব তথ্য বারকোডে নেই। বাটার মতো আন্তর্জাতিক একটি কোম্পানির বারকোডের যদি এই হাল হয় তাহলে সেটাকে কোনো সাধারণ বিষয় বলা যায় না। এছাড়া বাটার অফিসিয়াল ইমেইল আইডিতে অভিযোগ দিয়েও কোনো রকম সাড়া পাইনি আমি। এ থেকেও বাটা কোম্পানির অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে ওঠে।

যাই হোক, আমার কষ্টের টাকা দিয়ে কেনা জুতা এক্সচেঞ্জ করা হয়নি বাটার শোরুমে। কিন্তু আমিও হাল ছাড়িনি। এর শেষ না দেখে ছাড়বো না আমি।

কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নয়, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও বাটার শোরুমে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার, ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত বিপণি বিতান সানমার ওশ্যান সিটিতে বাটার বাটপারি ধরা পড়েছে। জুতার জগতে বিশ্বস্ত ও একদরের ব্র্যান্ড হিসেবে সুপরিচিত বাটার শোরুমে পাওয়া গেছে দুইদর। এদিন ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযান চালায় বাটার শোরুমে।

এসময় দেখা যায়, ১৯৯৯ টাকার জুতার গায়ে ২২৯৯ টাকার স্টিকার লাগিয়ে সুকৌশলে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে বাটার ক্রেতাদের সাথে প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করায় জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর বাটাকে এক লক্ষ টাকা জরিমানাও করে।

এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ঈদকে সামনে রেখে সানমার ওশ্যান সিটিতে পরিচালিত অভিযানে বাটার শোরুমে পুরনো জুতায় বেশি দামের নতুন প্রাইস ট্যাগ লাগানোর প্রমাণ পায় ভোক্তা অধিকার। তারা একটি জুতার ১৯৯৯ টাকার ট্যাগ উঠিয়ে ২২৯৯ টাকার নতুন ট্যাগ বসায়। বিষয়টি অভিযানকালে প্রমাণিত হয়। এই অপরাধে সতর্ক করাসহ বাটার শোরুমটিকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। ঈদের আগে আরও অভিযান চলবে। পরবর্তী অভিযানে একই অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।

উল্লেখ্য, বাটা একটি বহুজাতিক জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যার প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডে। বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে বাটার শাখা রয়েছে। এছাড়া ২৬টি দেশে জুতা তৈরির জন্য নিজস্ব কারখানা স্থাপন করেছে বাটা। ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাটা কোম্পানি ১৪ বিলিয়নেরও বেশি জুতা বিক্রয় করেছে।

বাংলাদেশে বাটা যাত্রা শুরু করে ১৯৬০ সালে। ১৯৬২ সালে বাটা একটি কারখানা তৈরি করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় টঙ্গীতে অবস্থিত বাটার কারখানা হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ক্যাম্প।

ঐতিহ্যবাহী সেই প্রতিষ্ঠানটির সুনাম এখন হুমকির মুখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই বাটার জুতা কিনে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ উঠছে। অনেক ক্রেতারই অভিযোগ, কেনার পর সপ্তাহ পার না হতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চকচকে নতুন জুতা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাটা নিজস্ব কারখানা ছাড়াও চীন থেকে আমদানি করা নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে আকর্ষণীয় ডিজাইনের জুতা তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে। ‘বাইরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’ মার্কা সেসব জুতার মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। ক্রেতারা ভীষণ অসন্তুষ্ট সেসব নিম্নমানের জুতা নিয়ে।

চীন থেকে আমদানি করা নিম্নমানের কাঁচামালই শুধু নয়, বাটার জুতা তৈরির সময় ব্যবহার করা হচ্ছে থ্যালেটর নামের একটি উপাদান যা মানব শরীরের জন্য প্রচন্ড ক্ষতিকর। জুতা তৈরিতে খাঁটি চামড়া ব্যবহারের কথা বলা হলেও আসলে ব্যবহৃত হচ্ছে রেক্সিনের তৈরি এক ধরনের চামড়া।

সাধারণত উন্নতমানের জুতার আউটসোল তৈরিতে ব্যবহার করা হয় পিপিআর বা থার্মোপ্লাস্টিক রাবার। কিন্তু বাটা কোম্পানির ব্যবহার করছে টিবিসির তৈরি আউটসোল যা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

এছাড়া বাটা কোম্পানি নিজস্ব কারখানায় জুতা প্রস্তুত না করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় খরচ কমাতে ৭০ শতাংশ জুতাই বাইরের বিভিন্ন কারখানায় তৈরি করে নিজেদের নামে বাজারে ছাড়ছে।