বঙ্গবন্ধুকে হারানোর ক্ষতি

126

ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন, অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জত আর সম্পদ-সম্পত্তির বিপুল ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। এ কারণেই দিনটি আমাদের মহান বিজয় দিবস। এ দিনেই পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে আমাদের হলো। এরপর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি। আর এই স্বাধীনতার মূল প্রেরণাশক্তিই ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি একটি স্বাধীন দেশের স্রষ্টা, মহান স্থপতি। তিনি বাঙালি জাতির পিতা। তাঁর সারা জীবনের সংগ্রাম, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, অসীম সাহস আর দেশপ্রেমের কারণেই আমরা পেয়েছি একটি জাতিরাষ্ট্র- স্বাধীন বাংলাদেশ। বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি স্বাধীন জাতি হিসেবে, গর্বিত আত্ম-পরিচয়ে।

অথচ স্বাধীনতার সেই মহানায়ককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো রাতের অন্ধকারে, তস্করের মতো! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে সেই শোকাবহ ঘটনা। একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। তাদের সাথে ছিলো আরো কিছু দেশি বেঈমান মীরজাফর। ছিলো বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরাও। যার জন্য স্বাধীনতা পেলাম, একটি স্বাধীন দেশ পেলামÑ তাঁকে হত্যা করতে ঘাতকদের বিবেকে একটুও বাধল না!

কেন তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল? কারণ, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি সুখী সুন্দর দেশ যেখানে মানুষ দু’ বেলা দু’ মুঠো ভাত পাবে। পরনের কাপড় পাবে। কেউ তাদের শোষণ করবে না। ঠকাবে না। অত্যাচার-নির্যাতন করবে না। তিনি আরও চাইলেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করুক। ধর্মীয় ভেদ-বিভেদ নয়, তিনি বললেন ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। পাশ্চাত্যের সেক্যুলারিজম বা তথাকথিত ‘ইহজাগতিকতাবাদ’ নয়; বঙ্গবন্ধুর দর্শনে ধর্মনিরপেক্ষতার তাৎপর্য ভিন্ন ধর্মকে বাদ দেওয়া নয়, যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। এর মূল চেতনা হলো: ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার। যারা সমাজে শোষণ আর বৈষম্য জিইয়ে রাখতে চায়। যারা চায় না গরিব মানুষের মুখে হাসি ফুটুক, বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়াক, স্বাবলম্বী হোকÑতারা বঙ্গবন্ধুর শত্রু হয়ে দাঁড়ালো।

যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীকে সাহায্য করেছিল এবং যারা ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মানুষকে ধোঁকা দেয় তারাও বঙ্গবন্ধুর শত্রুদের সাথে হাত মেলালো। ধর্মনিরপেক্ষতাকে তারা ধর্মহীনতা বলে অপপ্রচার চালাতে লাগলো। অথচ, এই বঙ্গবন্ধুই ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। মদ-জুয়া, রেসের ঘোড়দৌড় আইন করে নিষিদ্ধ করেন। মাদ্রাসা বোর্ড ঢেলে সাজান। তবলীগ জামাতের মারকাজের জন্য কাকরাইলে জমি বরাদ্দ দেন। ইসলামের স্বার্থে আরও অনেক কাজ করেন তিনি। এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিকÑ স্বাধীন দেশের এই মহান স্থপতিকে, জাতির পিতাকে হত্যা করে কাদের লাভ হয়েছিল? ক্ষতিই বা কাদের হয়েছিল?

লাভ হয়েছিল স্বাধীনতার শত্রুদের। যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে। বিভেদ আর সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ায়, তাদের লাভ হয়েছিল। কারণ, বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে তো ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কোনো সুযোগ ছিলো না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তারা আবার দাপটের সাথে ফিরে এলো। তারা পাকিস্তানি ভাবধারায় আবার সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের রাজনীতি করার সুযোগ পেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের দালাল এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো কোনো ব্যক্তি পরবর্তীতে মন্ত্রীও হলো। এদের মধ্যে শাহ আজিজুর রহমান, আবদুল আলিম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা যায়। তাদের গাড়িতে উড়ল শহিদের রক্তরঞ্জিত জাতীয় পতাকা। এর চেয়ে বড়ো লাভ তাদের জন্য আর কী হতে পারে! শুধু তাই নয়, তারা ব্যবসাবাণিজ্য আর অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে উঠল। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তারা কি তা করতে পারত? পারত না।

আর ক্ষতি হলো কার বা কাদের? বিপুল ক্ষতির শিকার হলো এই দেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলোÑ বাংলাদেশ হবে শোষণ-বঞ্চনাহীন একটি অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক আদর্শের দেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শহিদ হওয়ার পর দেশ সেই মূল চেতনা থেকে সরে এলো। তখনকার এবং পরবর্তী শাসকেরা রাতারাতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর আদর্শ বাদ দিয়ে পুরনো পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যেতে চাইল। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আল বদরদের কদর বেড়ে গেলো, আর মুক্তিযোদ্ধারা হলেন অবহেলিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলো-ঝলমল পথ থেকে অন্ধকার গুহায় ছিটকে পড়ল দেশ। ধর্মের নামে রাজনীতি আর রাজনীতির নামে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটল। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বাড়ল। ভয়াবহ জঙ্গিবাদ ক্রমে ক্রমে শিকড় গেড়ে বসল।

বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে আরও ক্ষতি হলো সেই সব মানুষের, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, শান্তি ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। নিকট-অতীতে সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড় এতই বেড়েছিল যে, তাদের কেউ কেউ জতীয় পতাকা পোড়ানো ও শহিদ মিনারের অবমাননা করার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে। কোনো কোনো গোষ্ঠী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে নানা আজেবাজে কথা বলেছে। সুখের কথা, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতা করেছিল, মানুষ মেরেছিল, মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল তাদের বিচার চলছে বিশেষ আদালতেÑ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বিচারে বেশ ক’জনের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। অন্যদের বিচারও চলছে। এদের বিচার বন্ধ করার জন্য বাধা দেয়ার সাহসও পেয়েছে তারা। হরতাল-ভাঙচুর-মানুষ হত্যা করতেও তারা পেছপা হয়নি। অথচ বঙ্গবন্ধুকে আমরা অসময়ে না হারালে এই অশুভ স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী অঙ্কুরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো, মাথা তুলতে পারত না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারত না।

তবে, অনেক বিলম্বে হলেও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি, তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা সেই দুরূহ কাজে হাত দিয়েছেন। সেদিন যা সহজ ছিলো, আজ তা অনেক কঠিন আর বাধাপূর্ণ হলেও সংকল্পে অবিচল নেত্রী সাহসের সাথে এগিয়ে চলেছেন। একাজে তিনি যে সফল হয়েছেন, যুদ্ধাপরাদীদের সর্বোচ্চ দণ্ড কার্যকরই তার দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার ও সাজা একদিকে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছে, অন্যদিকে শহিদদের আত্মা শান্তি পাবে; পরম শান্ত¦না পাবে শহিদদের স্বজনেরা, নির্যাতিত-ক্ষতিগ্রস্তরা। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের স্বপ্ন ছিলো দুঃখী মানুষের দুঃখ দূর করা, তাদের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি গ্রামে গ্রামে সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা চালু করে গরিব কৃষক ও ভূমিহীনদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দারিদ্র্য হটিয়ে জাতিকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন।

তিনি বলতেন, ‘ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত নাই। একটা জাতি যখন ভিক্ষুক হয়, মানুষের কাছে হাত পাতে: আমারে খাবার দাও, আমারে টাকা দাওÑ সেই জাতির ইজ্জত থাকতে পারে না। আমি সেই ভিক্ষুক জাতির নেতা থাকতে চাই না।’ তিনি সমাজের দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, কালোবাজারি, চোরাচালানকারী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে সবার প্রতি আহ্বান জানালেন: ‘দুর্নীতিবাজ খতম করো।’ সমাজের এই দুষ্টচক্র সবাই বঙ্গবন্ধুর শত্রু হয়ে গেলো নিজেদের ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের কারণে। তারা দেশের স্বার্থ দেখল না। কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কথা ভাবল না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মানে বুঝল না। তাদের সবার হিংসার আগুনে পুড়তে হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে।

আজ যারা শিশু-কিশোর বা তরুণ-যুবা, তারা হয়তো এখনই পুরোটা বুঝতে পারবে না বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে এ জাতির কী বিশাল ক্ষতি হয়েছে। তিনি যেভাবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তা অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেয় সমাজ-শত্রুরা। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রুরা। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে নিতে। স্বাধীনতাবিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান অনড়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে তাঁর সাফল্য আজ দেশ-বিদেশে স্বীকৃত, নন্দিত। স্বাধীন বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধরে রাখার জন্য আমাদের সবার উচিত তাঁর হাতকে শক্তিশালী করা। তাঁকে সমর্থন দেওয়া। তাহলে মহান জাতির পিতাকে হারিয়ে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নেয়া কিছুটা হলেও সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

পিআইডি ফিচার, লেখক : মুস্তাফা মাসুদ