পাহাড়ি হস্ত শিল্পকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে চান পারু চাকমা

96
পাহাড়ি হস্ত শিল্পকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে চান পারু চাকমা
পাহাড়ি হস্ত শিল্পকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে চান পারু চাকমা

বিপ্লব তালুকদার, খাগড়াছড়ি : খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানের ছাত্রী পারু চাকমা(৩২)।চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে। বিদ্যালয় থেকে পাননা কোন বেতনবা অন্য কোন সুযোগ-সুবিধা। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় প্রতিদিন খরচ হয় একশ টাকা। এই টাকা প্রতিদিন চাইতে হতো স্বামীর কাছ থেকে।মাঝে মাঝে ভাবতেন চাকরি ছাড়ার কথাও।তবে করোনা কালিন যখন ঘরবন্দি তখন জেনেছেন অনেকের অনলাইন ব্যবসা শুরু করার কথা। অনলাইন ব্যবসা তাকে উদ্বুদ্ধ করে তাঁকে। সে ভাবনা রূপ নিতে শাশুড়ির দেওয়া ৭হাজার টাকা দিয়েই শুরু করলেন অনলাইন ব্যবসা।

খাগড়াছড়ি মিলনপুর এলাকার বাসিন্দা পারু চাকমা অর্ণা। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা হোম ইকোনমিক্স বাগার্হ¯’্য অর্থনীতি কলেজে‘খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান’নিয়ে। স্বামী নোবেল চাকমা সরকারি চাকরি করেন। কলেজে পড়ার সময় থেকে স্বপ্ন দেখতেন উদ্যেক্তা হবেন। কিন্তু‘ বিয়ে, সংসার পর তার এ স্বপ্ন মনের ভিতরে থেকে যায়। তবে এখন স্বপ্ন দেখছেন পাহাড়ে পোশাক ও হস্ত শিল্পকে আরো প্রসার করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পারু চাকমা রয়েছে‘চাবুগি’নামে নিজের নামে পাতা। তার মাধ্যমে চলছে অনলাইন ব্যবসা। এতে সফলতা আসার পর খাগড়াছড়ি শহরের মিলনপুর এলাকায় খুলেছেন‘চাবুগি’নামেএকটি বিক্রয় কেন্দ্র। তার আছেন জনতাঁতি, তিনজন হস্তশিল্প কারিগড়, এবং চারজন টৈইলার্স।আর দোকান দেখা শোনা করার জন্যএকজন কর্মচারী।চাকমা ভাষায় চাবুগি অর্থ ‘চাকমা নারীদের পিনোনে বোনা রঙিন ফুলের নকশা’।আড়াই বছরেরএকমাত্র মেয়ে চাবুগি চাকমা নামেইএই নাম দিয়েছেন তিনি।

মিলন পুরে নিজের শো রুমে খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর করা পারু চাকমা উদ্যেক্তা হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন তৃতীয় মাত্রাকে। ছোট বেলা আমি নিজে সাজতে এবং ঘর সাজাতে খুব পছন্দ করতাম। বিশেষ কওে যারা বাড়িতে আসতো তারা আমাদের ঘরের দেয়ালে টাঙানো আলাম (কোমরতাঁতে বোনা চাকমাদের ফুলের নকশা)এবং বাশেঁর পাহাড়িদেরঐতিহ্যবাহী ঘর সাজানোর হস্তশিল্প গুলো দেখে পছন্দ করতেন। অনেকে আবার কেনার আগ্রহ প্রকাশ করতেন। আমার কাজ দেখে স্বামী চাইতেন আমি এসব নিয়ে কিছু একটা করি। মেয়ে ছোট হওয়ার কারনে প্রথমে ভয় পেয়ে ছিলাম। পরে স্বামী এবং শ্বাশুড়ির পরামর্শে পাহাড়ি পোশাক এবং হস্তশিল্প নিয়ে ব্যবসার করার চিন্তা মাথায় আসে।

২০১৯ সালে শেষের দিকে শ^াশুড়ি সুজলা চাকমার দেওয়া ৭ হাজার টাকায় ১০টা‘আলাম’দিয়ে শুরু করেন পারু চাকমা। সেটা ছিল পরিচিত জনদের কাছে। পরে ফেসবুক পাতা খোলেন। পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পোশাক, জুতা, ব্যাগ, শাড়ি, ট্রিপিচ, জুয়েলারি সহ পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী হস্ত শিল্প ফুল বারেং, মেঝাং, হুল্লেং, বান্দর সাঙ্গু সহ নানান পণ্যেও প্রচারণা চালান। এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার বসবাস করা পাহাড়িরা তাঁর কাছ থেকে পোশাক এবং বিশেষ কওে হস্তশিল্প কিনে নিয়ে যাছেন।

চারু চাকমা বলেন, ভালো জিনিস পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। বাঁেশর জিনিসপত্র একটুতেই ভেঙে য়ায়। কারিগড়েরা দুর্গম এলাকায় বসবাস করেন। তাদের কাছে সরাসরি গিয়ে দুর্গম এলাকা থেকে পণ্য নিয়ে আসা এবং অনলাইনে প্যাকেজিং ও ডেলিভারি- প্রতিটি ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।তবে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন স্বামী নোবেল চাকমা। তবে পারু বলেন, ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে নিজের ব্যবসার আনন্দও আছে। ব্যবসার লাভের টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এবং কাউকে উপহার দিতে কোন বাধা থাকেনা। তবে পরিবার পাশে না থাকলে একজন নারীর পক্ষে চাকরি সামলে উদ্যেক্তা হওয়া সম্ভব হতোনা।

পানছড়ি উপজেলায় মির্জিবিল এলাকায় বড় হয়েছেন অর্ণাচাকমা। গ্রামের স্কুল থেকেই এসএসসি। খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা হোম ইকোমিক্স থেকে স্নাতকএবং স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। ৭ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করলেও পারু চাকমার বর্তমান মূলধন ৬ লাখ টাকা। প্রথমে আলামদিয়ে শুরু করলেও এখন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পিনোন-হাদি, ত্রিপুরাদের রিনাই-রিচা, বুরগি, কোমর তাঁতের টেবিল রানার, কুশনকাভার, হাদি ওরনা, শার্ট, ধুতি, বা”চাদের পোশাক। এছাড়া পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী হস্ত শিল্প ফুল বারেং, মেঝাং, হুল্লেং, বান্দর সাঙ্গু, কুলা, দাবা সহ নানান সামগ্রী। এখন পাহাড়িদের বিয়ের পোশাকও বিক্রি করছেন তিনি।

অনলাইনে যখন ব্যবসা শুরু করেছিলেন পারু চাকমা তখন আয় হতো ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আর এখন আয় হয় প্রতিমাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর বিয়ে আর বৈসাবি মৌসুমে বিক্রি বেড়ে যায় অনেক। গত বৈসাবিতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি করেছেন। ব্যবসার আয় এবং পরিধি বাড়লেও এখানে থেমে থাকতে চাননা। পাহাড়ের পোশাক এবং হস্তশিল্পকে ছড়িয়ে দিতে চান দেশ-বিদেশে। পাহাড়ের তাঁতি এবং হস্তশিল্প কারিগড়দের নাম হবে সারা পৃথিবী জুড়ে। স্বপ্ন দেখেন,ড্রয়িংরুম থেকে খাবার টেবিল সব জায়গায় সাজানো থাকবে পাহাড়ের হারিয়ে যাওয়াঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প সামগ্রী।