পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনাময় এলাকা কেশবপুর

288
পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনাময় এলাকা কেশবপুর
পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনাময় এলাকা কেশবপুর

যশোর জেলা শহর থেকে ৩৩ কি. মি. পূর্ব দিকে ২৫৮.৫৩ বর্গ কি. মি. জুড়ে অবস্থিত কেশবপুর উপজেলা। ১১টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে এ উপজেলা শিক্ষা সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা রাজনৈতিক দিক দিয়ে বহুকাল পূর্ব থেকে প্রসিদ্ধ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সু-সাহিত্যিক মনোজ বসু, চলচ্চিত্রাভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য, সাহিত্যিক সরলা বসু, মানকুমারী বসুসহ বহু গুণির জন্মভূমি এ উপজেলাটি। ঠিক তেমনিভাবে প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের নির্দশনও প্রচুর রয়েছে উপজেলা জুড়ে। যে নিদর্শনগুলোকে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি গড়ে তোলা যায় তাহলে হতে পারে যশোর জেলার অন্যতম পর্যটন জোন কেশবপুর। যখন একটি উপজেলাতেই রয়েছে মহাকবি মাইকেলের জন্মভিটা – সাগরদাঁড়ির মধুপল্লী, রাজবাড়ি, ভরত রাজার দেউল, মির্জানগরের হাম্মানখানা মেহেরপুর দরগা, সু-সাহিত্যিক মনোজ বসুর বাড়ি, টেকনাফ থানার ঐতিহাসিক মাথিনের কূপের নায়ক চলচ্চিত্রাভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্যের জন্মভিটা সেখানেযে পর্যটকদের আকর্ষণ করবে এবং এলাকার অর্থনৈতিক ও আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে সেটা মনে করা যেতে পারে। শূধু তাই নয় এখানে দেখা মিলবে বিলুপ্ত প্রজাতির কালোমুখো হনুমান।

মধুপল্লী সাগরদাঁড়ি :
বাংলা সাহিত্যের সার্থক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালে জন্মেছিলেন যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে। যে কারণে গ্রামটি আজ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত। ১৮৪৩ সালে মধুসূদন খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন। তারপর তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় মাইকেল। ১৮৬১ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘ ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে সার্থক মহাকাব্যের পূর্ণাঙ্গ রুপের প্রকাশ ঘটে। মাইকেল মধুসূদনের এই মহাকাব্য বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ট মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তিনি বাংলা সাহিত্যে সনেটের জনক। সেই মধুকবির জন্মভিটাকে এবং কবির স্মৃতিকে জাগ্রত করতে মধুকবির বাড়িটি আজ মধুপল্লী। এই মধুপল্লী যশোর জেলা শহর থেকে ৪৫ কি.মি এবং কেশবপুর উপজেলা থেকে ১৩ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত। মধুকবির বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। যে নদকে তিনি ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে বসে স্মরণ করেছেন। রচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের নদী বিষয়ক প্রথম কবিতা। সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অীধদপ্তরের আওথাভূক্ত মধুকবির বাড়িটি আয়তন প্রায় সাড়ে চার একর। এ বাড়িতে ৫টি দালানে মোট ৩১ টি কক্ষ রয়েছে। বাড়ির ওঠানে জমিদার বাড়ির ঠাকুরঘর। দুটি পুকুর তাতে চমৎকার করে বাঁধানো ঘাট। মধুপল্লী ঘোষণা হওয়ার পর এখানে একটি মিউজিয়াম করা হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য। এই মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে কবির পরিবারের ব্যবহৃত কিছু আসবাবপত্র ও সে যুগের কারুকার্য খচিত কাঠের আরমারি ,খাট,লোহার সিন্দুক, কবির হাতের লেখা মুদ্রিত ফটোকপি, কবির ব্যবহৃত গ্রামোফোনসহ সে সময়কার বেশ কিছু নির্দশন। যা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাড়ির ভিতরে ঢুকে পূর্ব দিকে গেলে চোখে পড়বে কবির প্রসূতি স্থান। যেখানে কবি জন্মেছিলেন। শুধু তাই নয় মধুপল্লীর ডাক বাংলোর সামনে রয়েছে সে আমলের কিছু আমগাছ, কপোতাক্ষের ধারে রয়েছে কবির স্মৃতিবিজড়িত কাঠবাদাম গাছ, নদীর ধারে রয়েছে কবির বিদায় ঘাট। যে ঘাট দিয়ে তিনি সাগরদাঁড়ি থেকে শেষ বারের মতো বিদায় নিয়ে চলে যান। কবির বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে কবির আবক্ষ মূর্তি। বাড়ির সামনে এম এম ইন্সটিটিউশন ভবন। ভবনের সামনে আধুনিক ডিজাইনের মধুমঞ্চ। এই মধুমঞ্চে প্রতি বছর তাঁর জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয় ৭ দিন ব্যাপী জেলা প্রশাসন, যশোর এর আয়োজনে। মঞ্চের পেছনেই রয়েছে মধুসূদন একাডেমি । একাডেমির পরিচালক কবি খসরু পারভেজ। এই একাডেমির উদ্যোগে প্রতি বছর মধুসূদনের মৃত্যু বার্ষিকী পালিত হয়। সবকিছু মিলে মধুপল্লীতে আসলে মন জুড়িয়ে যাবে। দেখা যাবে কবির স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষের তীরের মধুপল্লীর সৌন্দর্য্য। কেশবপুর থেকে মটরসাইকেল, কিংবা থ্রি হুইলার যোগে যাওয়া যাবে মধুপল্লীতে।

ভরত রাজার দেউল:
কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে ১৯ কি.মি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গৌরিঘোনা ইউনিয়নের ভরত ভায়না গ্রামে ভদ্রা নদীর তীরে ভরতের দেউল অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এ দেউলটি ভরতের দেউল, ভরত রাজার দেউল বলে পরিচিত। দেউলটি গুপ্তযুগের খ্রিষ্টীয় ২য় শতকে নির্মিত হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। এর উচ্চতা ১২.২০ মিটার এবং পরিধি ২৬৬ মিটার। দেখতে উঁচু টিলার মতো। ১৯২৩ সালের ১০ জানুয়ারি তদানীন্তন সরকার এটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এ দেউলের খনন কাজ চালায়। তারপর এ দেউলের অবয়ব সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। এর প্রথম অংশে আকারের স্থাপনা, দ্বিতীয় অংশে একটি মঞ্চ, তৃতীয় অংশে মূল মন্দির দেখা যায়। খননের পর দেউলের ভিত থেকে চূড়া পর্যন্ত মোট ৯৪ টি কক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ স্থাপনার ৪ পার্শ্বে বর্ধিত আকারে মোট ১২ টি কক্ষ। বাকী ৮২ টি কক্ষ ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে এ বৌদ্ধ স্তুপটি তৈরী। আবার এর চূড়ায় দেখা গেছে ৪ টি কক্ষ। এ ৪ টি কক্ষের দুইপাশে আবার রয়েছে ছোট ৮ টি কক্ষ। খননের সময় প্রাচীন এ স্থাপনা থেকে পোড়া মাটির তৈরী নারীর মুখমন্ডল, দেবদেবীর নৃত্যের দৃশ্য সম্বলিত টেরাকোটার ভগ্নাংশ, নকসা করা ইট, মাটির ডাবর, পোড়া মাটির গহনা ইত্যাদি পাওয়া যায়। এ স্থাপনাটিতে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে তার আকার ১৬ ইঞ্চি * ১৩ ইঞ্চি * ৩ ইঞ্চি । এ অঞ্চলে অন্য কোন পরাকীর্তিতে এত বড় আকারের ইট ব্যবহৃত হয়নি। চমৎকার এ স্থাপনাকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। দেউলটি দেখতে হলে কেশবপুর থেকে পাঁজিয়া হয়ে ভরত ভায়না যেতে পারেন। কিংবা খুলনা জেলার চুকনগর থেকে ভরত ভায়না যাওয়া যাবে।

মীর্জা নগর হাম্মামখানা :
মোগল স্থাপত্যশৈলির চমৎকার নিদর্শন মীর্জানগর হাম্মামখানা। হাম্মামখানা হলো রাজা বাদশাদের রাজ প্রাসাদের কাছাকাছি গোসলের স্থান। মির্জানগর হাম্মামখানা কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে ৭ কি. মি.পশ্চিমে কপোতাক্ষ ও বুড়িভদ্রা নদীর সঙ্গমস্থলে ত্রিমোহিনী ইউনিয়নে মির্জানগর নামের গ্রামে অবস্থিত। মির্জা সফসি খানের নাম অনুসারে এ গ্রামের নামকরণ হয় মির্জানগর। ১৬৪৯ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা তার শ্যালক পুত্র মির্জা সফসি খান ও নুরুল্লাহ খানকে যশোরের ফৌজদার নিযুক্ত করেন। তারা মির্জানগরের নবাব বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। মির্জানগরের নবাব বাড়ি আজ আর না থাকলেও তারের নির্মিত হাম্মামখানাটি আজও কালের সাক্ষী হিসেবে রয়েছে। বর্তমানে এটি নবাব বাড়ি কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। সে যুগে নির্মিত এ হাম্মামখানাটির আকৃতি আয়তাকার। চমৎকার এই স্থাপত্যশৈলিটিতে চুন-সুরকি এবং বর্গাকৃতির ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ হাম্মামখানাটিকে সংরক্ষিত পুরাকৃতি হিসেবে ঘোষণা করে। এতে চার গম্বুজ বিশিষ্ট ইমারতের অভ্যান্তরে চারটি কক্ষ। কক্ষের চারপাশের প্রতিটি দেওয়ালে একটি করে কুলঙ্গি রয়েছে। পশ্চিম দিকে প্রবেশ পথ। চারটি কক্ষের একটি হলো প্রসাধন কক্ষ। এই প্রসাধন কক্ষ থেকে খিলানযুক্ত পথ দিয়ে আর একটি কক্ষে যাওয়া যায় । যেটি পোশাক বদলের কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। উত্তর কোনায় রয়েছে একটি জলাধার যেখান পানি রেখে পোড়া মাটির তৈরী পাইপের মাধ্যমে পানি গোসলখানায় সরবরাহ করা হতো। গোসল খানার মূল কক্ষটিতে আলো ঢোকার জন্য দেওয়ালে গোলাকার একটি ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে। পূর্ব পাশের দেওয়ালের বেষ্টনির ভিতরে রয়েছে পোড়া মাটির ইট দ্বারা তৈরি একটি গভীর কূপ। যে কূপ থেকে পানি এনে ছাদের দুটি চৌবাচ্চায় রেখে রোদে গরম করা হতো । পরে সেই পানি পোড়া মাটির নলের ভিতর দিয়ে হাম্ম¥খানায় সরবরাহ করা হতো। মোগল আমলে নির্মিত এই চমৎকার পুরাকৃতিটি দেখতে হলে যশোর থেকে বাসে কেশবপুর এসে ত্রিমোহিনী মোড় থেকে ভাড়ায়চালিত মটরসাইকেল কিংবা থ্রি হুইলার যোগে যাওয়া যাবে।

কথাশিল্পী মনোজ বসুর বাড়ি :
কথাশিল্পী মনোজ বসু ১৯০১ সালের ২৫ জুলাই যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলাধীন ডোঙ্গাঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতা রামলাল বসু ও মা বিধুমুখী বসু। মনোজ বসুর লেখা পড়ার হাতে খড়ি গ্রামের পাঠশালায়। পাঁজিয়া হাই স্কুলে তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন। তারপর কলকাতা। ভুলি নাই রাজনৈতিক উপন্যাস দিয়ে লেখকের উপন্যাসিক জীবন শুরু। এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি রক্তাত্ব দলিল যা পরবর্তীতে হিন্দি ও মালয়লম ভাষায় অনুদিত। ভ্রমন সাহিত্য যখন বাংলা ভাষায় বিরল তখন তিনি রচনা করেন ‘চীন দেখে এলাম’। এটি পরপর তিন বছর শ্রেষ্ট সাহিত্য পুরস্কার হিসেবে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘নরসিংহ দাস পুরস্কার অর্জন করে। ২১ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং শিক্ষক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রচনা করেছেন ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। এটি হিন্দি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। সুন্দরবন নিয়ে রচনা করেছেন‘জলজঙ্গল’ ও‘বন কেটে বসত’। চৌর্যবিদ্যা যে উপন্যাসের বিষয় বস্তু হতে পারে পৃথিবীর ইতিহসে প্রথম মনোজ বসু দেখিয়েছেন তাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘ নিশিকুটুম্ব’ এর মাধ্যমে। এটি ভারতের সর্বাপেক্ষা সম্মান জনক পুরস্কার একাডেমি পুরস্কার লাভ করে। তাছাড়া ও তিনি সৈনিক, ওগো বধূ সুন্দরী, বাঁশের কেল্লা, আমার ফাঁসি হলো, মানুষ নামক জন্তু, রক্তের বদলে রক্ত, মৃত্যুর চোখে আগুন, থিয়েটারসহ মোট ৩৩ টি উপন্যাস রচনা করেছেন। উপন্যাস ছাড়াও তিনি কবিতা ছোট গল্প রচনা করেছেন। বিখ্যাত এই কালজয়ী সাহিত্যেকের জন্মভিটা ডোঙ্গাঘাটা গ্রামটি কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে পূর্ব দিকে ৮ কি.মি দূরে অবস্থিত। বাড়িটি আজও কালজয়ী এ সুসাহিত্যিককে স্মরণ করিয়ে দেয় সাহিত্য প্রেমিক পাঠকদেরকে। কেশবপুর এলে দেখে যাওয়া যেতে পারে সাহিত্যে একাডেমি পুরস্কার, শরৎচন্দ্র পুরস্কার, মতিলাল ঘোষ পুরস্কার প্রাপ্ত মনোজ বসুর বাড়িটি।

ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি :
বিংশ শতাব্দীতে প্রথম দিকে শুরু করে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ে করে উপমহাদেশেীয় চলচ্চিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, জয় করেছিলেন লক্ষ মানুষের হৃদয় ধীরাজ ভট্টাচার্য। ধীরাজ ভট্টাচার্য চলচ্চিত্র জগৎ থেকে পুলিশ, পুলিশ থেকে নায়ক, নায়ক থেকে উপন্যাসিক । ইতিহাস খ্যাত টেকনাফ থানার মাথিনের কূপের নায়ক ধীরাজ ভট্টচার্য ১৯০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলাধীন পাঁজিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতা ললিত মোহন ভট্টাচার্য পেশায় ছিলেন শিক্ষক। মাতা লীলাবতী। ধীরাজের শিক্ষা জীবন শুরু হয় নিজ জন্মগ্রাম যশোর জেলার কেশবপুর থানাধীন পাঁজিয়া হাই স্কুলে। তারপর কলকাতা। ১৯২৫ সালে ‘সতীলক্ষী’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিনয়। তারপর কর্ম জীবন শুরু হয় পুলিশে চাকুরীর মধ্যে দিয়ে। কলকাতা থেকে তাকে এক সময় বদলি করা হয় এপার বাংলার কক্সবাজার জেলাতে। গান বাজনার প্রতি নেশা ও অধীর আগ্রহ থাকার কারণে তিনি কক্সবাজার বেশী দিন থাকতে পারেননি। সেখান থেকে তাঁকে বদলি হতে হয়েছিলো টেকনাফ থানায়। টেকনাফ গিয়ে তিনি সৃষ্টি করলেন এক বিখ্যাত ইতিহাস। মগী যুবতী মাথিন- বাঙালি ধীরাজ ভট্টাচার্য প্রেম কাহিনী। যা আজও কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে টেকনাফ থানার ভিতর মাথিনের কুপ নামে। সেই পুলিশ জীবন নিয়ে তিনি রচনা করেছেন আত্মজীবনী মূলক উপন্যাস ‘ যখন পুলিশ ছিলাম’। ধীরাজ ভট্টাচার্য অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন কোথাও নায়ক, কোথাও ভিন্ন চরিত্রে। তাঁর অভিনীত ছবি ‘গিরিবালা’ ‘কাল পরিনয়’ নৌকাডুবি’ ‘যমুনা পুলিন’ ‘চাঁদ সওয়াদাগর’ ‘পাষাণ দেবতা’ ‘মিলন’ ‘অভয়ের বিয়ে’ ‘ব্যবধান’ ‘রাজকুমারের নির্বাসন’ ‘স্বামীর ঘর’ সহ অনেক। বিখ্যাত এই ছলচ্চিত্র অভিনেতার জন্মভিটা যশোর জেলা শহর থেকে ৪০ কি.মি দূরে। কেশবপুর থেকে ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল কিংবাথ্রি হুইলার যোগে যাওয়া যাবে ধীরাজ অট্টাচার্যের বাড়ি দেখতে।

মেহেরপুর দরগা :
‘দরগা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দরবেশের মাজার বা কবর। ঠিক এমনি একটি দরগা হলো কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে ১৬ কি. মি.পশ্চিমে কপোতাক্ষ নদের তীরে পীর মেহেরুল্লার দরগা। যতদূর জানা যায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য সুন্দরবন অঞ্চলে এসে তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন এখানে। এ দরগাটি সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের মেহেরপুর গ্রামে অবস্থিত। যতদূর জানা যায় মেহেরুল্লার নাম অনুসারে এখানকার নাম হয়েছে মেহেরপুর। এই দরগা এলাকাটি ৩ একর ১৬ শতাংশ জমির উপর ৪ টি বৃহৎ আকৃতির বট বৃক্ষ ও একটি বকুল বৃক্ষের সমন্বয়ে ছাতার মতো করে ঢেকে রেখেছে। সে এক মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। মূল দরগাটির দৈর্ঘ্য প্রস্থ ১৬ ফুট ৩ ইঞ্চি বর্গাকৃতির। এ মাজারটির ভিতরে ঢুকে চারিদিকে ঘুরে আসার ব্যবস্থা রয়েছে। মূল কবরের উপর ভবনটি কারুকার্য খচিত ইট দারা তৈরী । ভীষণ অবাক হওয়ার মতো কিছু বিষয় লক্ষ্য করা যায় এখানে যেমন পুরো এলাকাটা বট বৃক্ষের দ্বারা ঢাকা তেমনি কোন কোন বৃক্ষের শিকড় একেবারে কুমিরের আকৃতি ধারণ করে ভেসে আছে মাটির উপরে। আবার এ এলাকাতে মাজারের মাহাত্ম সম্পর্কে অনেক কেরামতির কথাও বহুল প্রচলিত। জনৈক ব্যক্তির ঘোড়া হারিয়ে গেলে তিনি খুজতে খুজতে দরগা এলাকাতে এসে দেখে একটি ঘোড়া শুয়ে আছে। নিজের ঘোড়া মনে করে একটি লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করতেই ঘোটাটি বাঘ হয়ে লোকটির মাথায় আঘাত করে । লোকটি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলো। তারপর একদিন স্বপ্ন দেখে দরগা থেকে বালি এনে সেঁক দিলে ভালো হবে। এমনি অনেক ঘটনা। মেহেরপুর যেতে হলে কেশবপুর থেকে ভাড়িয় চালিত মটর সাইকেল কিংবা থ্রিহুইলার যোগে চিংড়া বাজার হয়ে যাওয়া যাবে।

লেখক : তাপস মজুমদার, প্রভাষক, লেখক ও প্রাবন্ধিক