পদ্মা সেতু আমাদের গর্বের সেতু

96

জীবনের অর্ধেকটা অপেক্ষাতেই কাটিয়ে দিলাম ভাতিজা। চল্লিশ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছি। কত যে অপেক্ষার দিন কাটিয়ে দিলাম এক মাওয়া ঘাটেই। কত রোদ, বৃষ্টি আর কঠিন শীত কাটিয়েছি মাওয়া ঘাটে। কখনো চার পাঁচ ঘন্টা কখনো আট দশ ঘন্টা আবার কখনো বা বিশ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে ফেরির জন্য। একটা সময় এই সবই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। এমনকি অপেক্ষা করতে করতে দুই দিনও কাটিয়ে দিয়েছি। শুধু কী অপেক্ষা! ভোগান্তিরও যে শেষ ছিল না।

আরেক পিকআপের চালক বললেন, চাচা ভোগান্তি তো সব শেষ হয়েই গেল। পদ্মা সেতু তো হয়েই গেছে। আর প্রধানমন্ত্রীও উদ্বোধন করে দিয়েছেন। আর চিন্তা কী? ভাড়া বেশি লাগলেও ভোগান্তি তো আর নাই। বেশি করে ট্রিপ মারতে পারছি। এতেই পুষিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। বাসযাত্রিদের তো আরও আরাম। এক বাসেই ঢাকা যাচ্ছে। মানুষের অনেক সময় বেঁচে যাচ্ছে। মানুষ বরিশাল থেকে ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে মাত্র চার ঘন্টায়। এটা কেউ তো কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। পদ্মা সেতুটা হয়ে অনেক উপকার হলো। 

হাসি মুখে চাচা বললেন, আরে ভাতিজা পুরানা কষ্টের কথা মনে করছি বলেই তো আনন্দ আরও বেশি পাচ্ছি। মনে বড়ো আনন্দ ভাতিজা। আমাদের শেখ হাসিনা উদ্বোধন করে আমাদের পদ্মা সেতু চালু করে দিলেন। তিনিই সবার আগে টোল দিয়ে পাড়ি দিলেন পদ্মা সেতু। জাজিরা পয়েন্টে গিয়ে লাখো মানুষের মাঝে হাজির হলেন। নিজের চোখে মানুষের খুশি দেখলেন। সেই লাখো মানুষের একজন কিন্তু আমিও। বুক ফুলিয়ে এই সেতুর উপর দিয়ে যখন পিকআপ চালিয়ে যাই তখন আনন্দে বুকটা ভরে উঠে। মেয়েটার সাহস আছে রে।

ভাতিজা বলল, সাহস তো থাকবেই। দেখতে হবে না কার মেয়ে তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে বলে কথা। ঠিক বলেছিস ভাতিজা, তাঁর সাহসী বাবার কারণেই দেশটা পেলাম। তাঁর বাবাও সব অন্যায় আর ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। গরিব আর অসহায় মানুষের কথা শুধু তিনিই ভাবতেন। তাঁর মেয়েটাও তাঁরই মতো। সব ষড়যন্ত্রের শিকল ছিঁড়ে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে পদ্মা সেতু। দেশের টাকায় পদ্মা সেতু করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। পদ্মা সেতু নিয়ে কম তো ষড়যন্ত্র হয়নি। বিশ্বব্যংক দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে প্রতিশ্রুতি তুলে নিল। অন্যান্য দাতারাও ভিড়ল তাদের দলে। সেতুর ভবিষ্যৎ তখন কী যে হুমকির মুখে পড়েছিল। সেতুর নির্মান কাজই তো অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। আহা, তখন সমালোচকদের খুশি আর দেখে কে। কত হাসাহাসি। কত মন্তব্যের ঝড় যে তুলেছিল সমালোচকেরা। একবার ভাবো তো বাতিজা, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ এনে বোর্ড সভা না করেই সেতুর টাকা বন্ধ করে দিল! এটা কী ঠিক হলো? সত্য কখনো চাপা থাকে না। কিছুদিন পরে হলেও সত্যটা তো প্রমাণই হয়েছে। তখন মুখটা রইল কই ওদের? আর নিন্দুকের দল, ছাই পড়েছে ওদের সবার নিন্দুকর মুখে।

ঠিক বলেছেন চাচা। আপনি তো বললেন শুরুর কথা। পদ্মা সেতু নির্মাণ শুরু হওয়ার পরই তো আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হলো। এটা তো আর সাধারণ নদী না। পদ্মা নদী বলে কথা। সারা পৃথিবীতে এমন নদী উত্তাল নদী মাত্র দুটো আছে। এক হলো আমাজন আর এক আমাদের পদ্মা। আমাজনে তো আার সেতু নেই। আমাদের পদ্মায় কিন্তু সেতু হলো। এই সেতু বানানো ছিল একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রথমে তো নদী শাসন আর পাইলিংয়ের জন্য সাহসী এবং যুগান্তকারী প্রকৌশল দক্ষতা দরকার হলো। একই সাথে বাড়তে থাকল খরচ। তারপরও কাজ কিন্তু চলতেই থাকল। এমনকি করোনার মধ্যেও পদ্মা সেতুর কাজ চলেছে পুরোদমে। শেখ হাসিনার কঠিন ইচ্ছাশক্তির কারণেই পদ্মা সেতুর কাজ একদিনের জন্যেও বন্ধ হয়নি।

চাচা বললেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, এমন ভালো খবর নিন্দুকের সইবে কেন? সেই জন্যেই তো ষড়যন্ত্রকারীরা গুজব ছড়াতে থাকল। ‘সেতু তৈরিতে মাথা লাগবে’ গুজব বানিয়ে ফেলল। আরে মাথা তো লাগবেই। নইলে এত বড়ো কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হবে কী করে? অনেক মাথা মানেই তো অনেক লোক। অনেক শ্রমিক। মাথা ছাড়া কোনো মানুষ আমি তো দেখিনি ভাতিজা। তুই দেখেছিস কখনো? কী আজব গুজব রে বাবা! গুজব যদিও আজবই হয়।

চাচা, সরকার কিন্তু খুবই দক্ষতার সাথে এই গুজব মোকাবিলা করেছে। সবকিছু মেকাবিলা করে আজ পদ্মা নদীর উপর নির্মিত হয়েছে বহুমুখী সড়ক ও রেলসেতু। খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গ, ঝিনাইদহ ও মাগুরা। বরিশাল বিভাগের, বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীর মতো একুশটি জেলার মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে এই সেতু। এই সেতু নিয়ে কতো যে স্বপ্ন দেখছিল এই অঞ্চলের মানুষগুলো। পদ্মা সেতু রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করে দিয়ে সে স্বপ্ন পূরণ করেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই বদলে গেছে।

বদলাবে না! পদ্মা সেতু যে বাংলাদেশের আসা ভরসার স্বপ্নের প্রকল্প। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো সেতু। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু। আর প্রশস্ত ১৮ দশমিক ১০ মিটার। সড়ক চলাচলের জন্য প্রথম নির্দিষ্ট নদী পারাপার। দ্বি-স্তরের ইস্পাত ট্রাস সেতুটি উপরের স্তরে একটি চার লেনের মহাসড়ক। আর নিচের স্তরে একটি একক-ট্র্যাক রেলপথ। স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্ট এবং শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টকে সংযুক্ত করল। সে কারণেই যাত্রী আর মালবাহী যানবাহনের জন্য যাত্রাটাও খুব সহজ হয়ে গেল।

শোনো চাচা, শুধু তাই না এজন্য দেশের জিডিপিও বাড়বে। শুনেছি দেশের জিডিপি ১ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে গিয়ে ২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। তা তো বাড়বেই। এরই মধ্যে হাজার হাজার গাড়ি চলতে শুরু করেছে সেতুর উপর দিয়ে। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশকে সংযুক্ত করেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বিভিন্ন ঘটনার সাথেও সেতুটি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। সেতু চালু হলে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে অর্থনীতির কাঠামোই বদলে যাবে। ব্যাপক উন্নয়ন হবে কৃষিরও। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য পরিবহণে তৈরি হবে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাবে। এই পদ্মা সেতুকে ঘিরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর শীল্পায়নও ঘটবে। যোগাযোগ আর পরিবহণ ক্ষেত্রেও রীতিমতো বিপ্লব ঘটবে। পর্যটনের কথাটা না বললেই নয়। পদ্মা সেতুর জন্য পর্যটন শিল্পেরও উন্নয়ন হবে। পদ্মা সেতুর মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর অংশে ছয় লেনের যে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তা ভীষণ নজরকাড়া। সংস্কৃতিতেও এই সেতু অনন্য ভূমিকা রাখবে। সেতুর চারপাশে গড়ে উঠবে রিসোর্ট, হোটেল-রেস্তোরা। কত রকমের বাঙালি খাবার যে সেখানে থাকবে। বিদেশিরাও তখন বাঙালি খাবার উপভোগ করবে। আমার মনে আছে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর শুরু হয়েছিল পদ্মা সেতুর নির্মান কাজ। সেই সেতু আজ গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের টাকায় সেতু নির্মান করায় বিশ্ব দরবাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আর ভাবমূর্তি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এটা একমাত্র সাহসী বাপের সাহসী বেটির পক্ষেই সম্ভব। বুঝলে ভাতিজা।

জী চাচা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সাহসী সিদ্ধান্ত তাঁকে একজন আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব। শেখ হাসিনা আর পদ্মা সেতু যেন একই নাম। নদীর নামে সেতুর নাম হলেও তাদেরকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। সেতুটার দিকে তাকালেই মনে পড়ে শেখ হাসিনার ত্যাগ, সাহসীকতা আর সাফল্যের কথা। তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা আমাদেরকে এই দেশটা দিয়ে গেছেন। আর তাঁরই সাহসী কন্যা আমাদের দিয়েছেন অনেক কিছু। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল এই পদ্মা সেতু করা। তিনি কঠিন কাজগুলোকেই বেশি ভালোবাসেন। তাই তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে আমাদেরকে পদ্মা সেতু উপহার দেওয়া। আল্লাহ তাঁকে ভালো রাখুক।

পিআইডি ফিচার, লেখক : সুলতানা লাবু