নিঝুমদ্বীপে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন ১০৮ প্রবীণ

119
নিঝুমদ্বীপে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন ১০৮ প্রবীণ
নিঝুমদ্বীপে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন ১০৮ প্রবীণ

তাজুল ইসলাম তছলিম, হাতিয়া, নোয়াখালী থেকে : কেউ চোখে মোটেও দেখেন না, কারো চোখে পর্দা পড়ে গেছে, কারো আছে চোখের নেত্রনালীর সমস্যা। হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপে এ ধরনের ১০৮ প্রবীণকে চোখের অপারেশন করে দৃষ্টিশক্তি এনে দিলো একটি বেসরকারী সংস্থা। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই ব্যবস্থাটি করে দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা নামে বেসরকারী এই সংস্থাটি ।

আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হওয়ায় খরচ বহন করে জেলা সদরে গিয়ে এসব প্রবীনের পক্ষে চোখের চিকিৎসা করা অস্বভব হয়ে উঠে। এতে গ্রামের প্রত্যান্ত অঞ্চলের আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল এসব প্রবীনরা ভিক্ষাবৃত্তিসহ মানবেতর জীবন যাপন করতেন।

দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে গত দুই বছরে ৪টি দাপে নিঝুমদ্বীপের ১০৮ জনকে এই সূযোগ করে দেওয়া হয়। সমৃদ্ধি কর্মসূচীর স্বাস্থ্য সেবা ও পুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় নিঝুমদ্বীপের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে এদের বাচাই করা হয়।

সব শেষে গত জুলাই মাসে ১৪ জনকে নোয়াখালী জেলা সদর অন্ধকল্যান হাসপাতাল থেকে অপরাশেন করানো হয়। এখন তারা নিঝুমদ্বীপে নিজেদের বাড়ীতে অবস্থান করছেন। সংস্থার নিজস্ব ডাক্তার প্রতি সপ্তাহে গিয়ে তাদের ফলোআপ করছেন।

জুলাই মাসে ছানি অপারেশন করে বাড়ী আসা নিঝুমদ্বীপের ২নং ওয়ার্ডের ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্ধা মো: মোস্তাফ (৭২) জানান, দুই ছেলেসহ পরিবারের ৬ সদস্যকে নিয়ে তঁার বসবাস। ছেলেরা নদীতে মাছ শিকার করে জিবীকা নির্বাহ করে। গত তিন বছর ধরে সে চোখে তেমন একটা দেখেন না। একবার উপজেলা সদরে প্রাইভেট এক হাসপাতালে গিয়ে চোখ দেখানোর পর তাকে ছানি অপারেশন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে তার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে উঠে নি। অনেকটা ঘর বন্ধি হয়ে যান তিনি। সংবাদ পেয়ে দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা এসে তাকে বাড়ী থেকে নিয়ে যান। জেলা সদরের একটি হাসপাতালে গত মাসের ( জুলই) শেষের দিগে তার ছানি অপারেশন করানো হয়। এখন তিনি চোখে ভালো ভাবে দেখতে পান। প্রতি বৃহস্পতিবার ডাক্তার এসে দেখে যান তাকে।

একই অবস্থা নিঝুমদ্বীপের পূর্বাঞ্চল গ্রামের বাসিন্ধা মো: সালা উদ্দিনের (৭৫)। এক সময় বাজারে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। গত তিন বছর চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ভিক্ষা করে চলতো সংসার। পরিবারের তিন ছেলে সবাই পৃথক হয়ে যাওয়ায় সরকারী খাল পাড়ে বৃদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে একা বসবাস করেন তিনি। নিঝুমদ্বীপে চোখের চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় কখনো ডাক্তার দেখানোর সূযোগ পান নি। নিঝুমদ্বীপ থেকে উপজেলা সদর দুরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো না। তাই প্রয়োজন অনুধাবন করলেও ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি। গত মাসে বাজারে ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখে গ্রামের এক জন তাকে দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার বন্দরটিলা কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তারা তাকে সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে জেলা সদর নিয়ে চোখের অপারেশন করে দিয়েছে। এখন সে আগের মত দেখতে পান। আগামী সপ্তাহ থেকে আগের মত সবজির ব্যবসা শুরু করবেন বলে জানান এই বৃদ্ধ।

এই কাজের দায়িত্বে থাকা সমৃদ্ধি কর্মসূচীর সমন্বয়কারী মো: নুরন্নবী জানান, নিঝুমদ্বীপে গত চার বছর ধরে তারা স্বাস্থ্য সেবা ও পুষ্টি নিয়ে কাজ করছেন। এতে বিনা মূল্যে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন তাদের নিজস্ব ডাক্তার। এতে দেখা যায় গ্রামের প্রত্যান্ত অঞ্চলের অস্বচ্ছল কিছু লোক চোখের ছানি ও নেত্রনালীসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভোগতেছে। এদের কথা চিন্তা করে সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত দুই বছরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে চার ধাপে ১০৮ জন নারী,পুরষ প্রবীন লোককে চোখের ছানি, নেত্রনালীর অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিজন রোগীর জন্য জেলা সদরে আসা যাওয়া থাকা ও অপারেশনসহ সংস্থার প্রায় ৭ হাজার টাকা করে খরচ করতে হয়েছে। সংস্থার নিজস্ব লোকজন এদের দেখা শুনার কাজে নিয়েজিত থাকেন। অপারেশন শেষে বাড়ী আসার পর সংস্থার নিজস্ব ডাক্তার প্রতি সপ্তাহে একবার এসে এদের ফলোআপ করছেন।

এব্যাপারে নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিনাজ উদ্দিন বলেন, সাগর পাড়ে অবস্থান নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় এখানে স্বাস্থ্য সেবার তেমন উন্নয়ন হয়নি। জটিল কোন রোগ দেখা দিলে ৪০ কিলোমিটার অতিক্রম করে যেতে হয় উপজেলা সদরে। দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা অনেক দিন থেকে নিঝুমদ্বীপে কাজ করছে। বিনা মূল্যে প্রবীনদের চোখের অপারেশন করে দিচ্ছেন তারা। সংস্থার লোকজনের সাথে আমার কথা হয়েছে। এই কাজে আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ও তাদেরকে সহযোগীতা করতে আগ্রহী আছি।

হাতিয়ায় ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৭ লাখ লোকের বসবাস। উপজেলা সদরে ৫০ শয্যার হাসপাতালটি দ্বীপের চিকিৎসা সেবার একমাত্র অবলাম্বন। হাতিয়ার চার পাশে নিঝুমদ্বীপসহ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের লোকজনকে জরুরী চিকিৎসা নিতে হলে আসতে হয় এই হাসপাতালে। কিন্তু এই হাসপাতালে চোখের উন্নত চিকিৎসা সেবার কোন ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে চোখের সমস্যা নিয়ে আসা রোগীরা ছুটে যান জেলা সদরে। যাতে অতিরিক্ত সময় ও আর্থিক ব্যায় বেশি করতে হয়।