নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্ররা মুখোমুখি যে কারণে (সিসিটিভি ভিডিও)

322

রাজধানীতে নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে নিরীহ কুরিয়ারকর্মীর প্রাণহানিসহ মঙ্গলবার যে তুলকালাম কান্ড ঘটে গেছে তার নেপথ্যের কারণ জানা গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে সংঘর্ষের মূল কারণ।

নিউ মার্কেটের দুটি ফাস্টফুড দোকান কর্মীদের নিজেদের মধ্যে বিরোধের জের ধরেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মূল ঘটনা ধরা পড়ে সোমবার রাত ১১টা ০৩ মিনিটে। রামদা হাতে সাদা টি-শার্ট পরিহিত এক তরুণের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল নিউ মার্কেটের ওয়েলকাম ফাস্টফুডে ঢোকে। সেখানে দোকানের বাইরে হট্টগোল হয়। কিছুক্ষণ পর মার খেয়ে ওই তরুণরা পালিয়ে যায়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে হেলমেটধারী কিছু তরুণকে চার নম্বর গেট ভাঙতে দেখা যায়। তারা রাত ১২টার দিকে দুই নম্বর গেট খুলে মার্কেটে ঢুকে ভাঙচুর করে বেরিয়ে যায়। তখন ব্যবসায়ীসহ হকাররা ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে খাবারের দাম নিয়ে দোকান কর্মীদের বাকবিতণ্ডার জের ধরে সংঘর্ষের সূত্রপাত- এমন খবর ছাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও আসলে মূল ঘটনা মোটেও এমন না।

যে কারণে নিউ মার্কেট ও ঢাকা কলেজ সংলগ্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় তার পেছনে দায়ী নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ইফতার সামগ্রী বিক্রির জন্য টেবিল বসানোর জায়গা দখলের ঘটনা থেকেই মূলত এই সংর্ষের সূচনা।

প্রতিদিন ইফতারের আগে নিউ মার্কেটের সব ফাস্টফুডের দোকানের সামনে চেয়ার ও টেবিল পেতে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করা হয়। মূলত এই টেবিল বসানোর জায়গা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় গত শুক্রবার। চলমান দন্দ্বরে বিস্ফোরণ ঘটে সোমবার। সেদিনও আগের কয়েকদিনের মতো টেবিল বসানো নিয়ে ঝামেলা বাঁধে।

সোমবার সন্ধ্যায় ইফতারির সময়ে একই মালিকের দুটি ফাস্টফুড দোকানের কর্মীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। পরে ঢাকা কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে ডেকে আনা হয়। তারা সেখানে ব্যবসায়ীদের ওপর চড়াও হলে ব্যবসায়ীরাও পাল্টা তাদের মারধর করেন। ক্যাম্পাসে ফিরে গিয়ে মিথ্যা প্রচারণা রটায় মার খেয়ে ফিরে যাওয়া ছাত্ররা। এরপরই শুরু হয়ে যায় ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। দফায় দফায় চলে সেই সংঘর্ষ।

নিউ মার্কেটের চার নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলে ডান দিকের দ্বিতীয় দোকানটি ওয়েলকাম ফাস্টফুড ও সরু গলির ঠিক উল্টো দিকেই ক্যাপিটাল ফাস্টফুড। দুটি দোকানেরই মালিক নিউমার্কেট থানা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরদার।

ক্যাপিটাল ফাস্টফুড চালান মালিকের আপন ভাই শহিদুল। অন্যদিকে ওয়েলকাম ফাস্ট ফুড চালান মালিকের চাচাতো ভাই রফিক। প্রতিদিন ইফতারের আগে প্রতিটি ফাস্টফুডের দোকানের সামনে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে ইফতার বিক্রি করা হয়। মূলত এই টেবিল বসানোর জায়গা নিয়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

সোমবার সন্ধ্যায় ইফতারির টেবিল বসানো নিয়ে ক্যাপিটাল ফাস্ট ফুড এবং ওয়েলকাম ফাস্টফুডের কর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ইফতারির পর ওয়েলকাম ফাস্টফুডের কর্মীরা ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের কয়েকজনকে ডাকেন।

এক ছাত্রলীগ নেতা ৮-১০ জনের দল নিয়ে নিউ মার্কেটে ঢুকেই ক্যাপিটাল ফাস্টফুড কর্মীদের মারধর করে। এসময় আশপাশের দোকানের কর্মীরাও এগিয়ে এসে ছাত্রদের পাল্টা মারধর করেন।

মার খাওয়ার পর ক্যাম্পাসে ফিরে গিয়ে মূল ঘটনা আড়াল করে মিথ্যা অপপ্রচার ছড়ান মার খাওয়া ছাত্ররা। ঢাকা কলেজের ছাত্রদের গায়ে হাত তোলার বিষয়টি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির এক থেকে দেড়শ’ ছাত্র একযোগে হামলা চালান নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ওপর। হামলা প্রতিহত করতে ব্যবসায়ীরাও পাল্টা হামলা চালান।

দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ি ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। ধীরে ধীরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। নিউ মার্কেট ছাড়াও আশপাশের সব মার্কেটের ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এরপর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতেই থাকে।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। কিন্তু সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে প্রচুর পুলিশ পাঠানো হয় সেখানে। রাতভর সংঘর্ষ শেষে ভোর ৪টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু রাত পেরিয়ে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এসময় গণমাধ্যম কর্মীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক কুরিয়ার কর্মীর মৃত্যু হয়।

সিসিটিভি ফুটেজ