দুর্নীতিবাজ উপাচার্যদের বিচার চাইলেন খোদ উপাচার্যরাই

74
দুর্নীতিবাজ উপাচার্যদের বিচার চাইলেন খোদ উপাচার্যরাই
দুর্নীতিবাজ উপাচার্যদের বিচার চাইলেন খোদ উপাচার্যরাই

এবার খোদ উপাচার্যরাই দুর্নীতিবাজ উপাচার্যদের বিচার চাইলেন। শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যরা।

এ সময় তারা উলি­খিত দাবি জানিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ (ইউজিসি) সরকারি তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। কেননা, তাদের কারণে গড়ে সব উপাচার্যের দিকে সন্দেহের আঙুল উঠছে। নষ্ট হচ্ছে সব উপাচার্যের ভাবমূর্তি।

শিক্ষামন্ত্রী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্র“তি দেন। পাশাপাশি তিনি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অনিয়ম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। সভায় যোগ দেওয়া একাধিক উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

বুয়েটের কাউন্সিল ভবনে বিকাল ৪টার দিকে সভা শুরু হয়ে চলে ৬টা পর্যন্ত। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হাবিবুর রহমান।

এতে বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা অংশ নেন। সূত্র জানায়, সভা শুরুই হয় উপাচার্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত আলোচনার মধ্যদিয়ে। ২৮ আগস্ট খুলনা কৃষি

বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুকৃবি) উপাচার্যের পরিবারের নয় সদস্যসহ ৮২ জনের নিয়োগ বাতিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আদেশ দেয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে সভাটি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে উপাচার্যদের দুর্নীতি-অনিয়ম সবার আগে আসে।

সভায় অংশ নেওয়া একজন উপাচার্য জানান, তাদের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীকে বলা হয়েছে-কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অন্যরা সর্তক থাকবেন। কারণ একজন উপাচার্য অনিয়মে জড়িয়ে গেলে সেটা অন্যদের জন্য আর সম্মানজনক থাকে না।

এ সময় শিক্ষামন্ত্রী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির তৈরি নীতিমালা অনুসরণ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটি অনুসরণ করলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধ হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

উপাচার্যদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে কয়েকজন বলেন, তারা চাইলেও স্থানীয় চাপ ও তদবিরে সঠিকভাবে নিয়োগ দিতে পারেন না। বিশেষ করে শিক্ষকের ক্ষেত্রে মানসম্মত নিয়োগ ব্যাহত হয়। এ সময় নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রেও ছাত্রনেতা এবং স্থানীয় চাপের কথা কেউ কেউ উলে­খ করে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বা গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে নির্মাণ কাজ পরিচালনা করা প্রয়োজন।

উপাচার্যরা বিভিন্ন অডিট আপত্তির ব্যাপারেও কথা বলেন। তারা জানান, বই কেনা, টেলিফোন, দায়িত্ব ভাতা ইত্যাদির ব্যাপারে আপত্তি উঠছে। এ সময় উপাচার্যরা আরও বলেন, তারা দায়িত্ব ভাতা পান মাত্র দেড় হাজার টাকা। এটা বাড়ানো প্রয়োজন।

এছাড়া তারা পিএইচডির ওপর ইনক্রিমেন্ট দাবি করে বলেন, ২০২২ সাল থেকে এটা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু ২০১৫ সালে নতুন পে-স্কেল দেওয়া হয় তাই তখন থেকেই এটি কার্যকরের পরামর্শ দেন তারা। এছাড়া অধ্যাপকদের একটি অংশকে সিনিয়র সচিবের সমান মর্যাদায় ‘সুপার গ্রেড’ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। এভাবে উপাচার্যরা দায়িত্ব পালনে যেসব সমাস্যার সম্মুখীন হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও বৈষম্য তুলে ধরেন।

সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে উপাচার্যরা চলতি বছরের বাজেটের প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা বলেন, বিভিন্ন খাত মিলিয়ে গত বছরের তুলনায় এবারে ২৫ শতাংশ বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে কন্টিজেন্সি খাতেই ৫০ শতাংশ আছে।

এছাড়া গাড়ি কেনায় নিষেধাজ্ঞা আছে। জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমূল্য আছে। কিন্তু এ খাতে ২৫ শতাংশ ব্যয় কমাতে বলা হয়েছে। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা ইউজিসিকে দোষারোপ করে বলেন-শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ সৃষ্টির আবেদন করা হলেও পাওয়া যায় না। বিশেষ করে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা বেশি। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, লিফট আছে কিন্তু লিফটম্যান দেওয়া হয়নি।

উপাচার্যরা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরে বাড়িভাড়া কিছুটা বেশি। তাই অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে থাকেন। কিন্তু একই হারে মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়িভাড়া কাটায় তা স্থানীয় বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাঁড়ায়। এ কারণে অনেকেই ক্যাম্পাসের কোয়ার্টার ফেলে বাইরে বসবাস করেন। এতে কোয়ার্টার খালি থাকে ও সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়। তারা বাড়িভাড়া কমানোর পরামর্শ দেন। এতে শিক্ষকরা কোয়ার্টারে থাকতে আগ্রহী হবেন।

উপাচার্যরা এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষকরা না থাকলে উপাচার্যের একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি অবস্থায় হল বন্ধ করা বা অন্য কোনো সমস্যা হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। যে কোনো সমস্যায় শিক্ষকদের সহায়তা প্রয়োজন হয়। উপাচার্যরা তাদের নিয়ে সব সিদ্ধান্ত নেন। শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে না থাকলে সে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হয় না। তাই তাদের ক্যাম্পাসে রাখা দরকার।

জানা গেছে, সভায় শিক্ষামন্ত্রী উপাচার্যদের বলেছেন, তাদের প্রস্তাব ও সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে তিনি ফের বসবেন তাদের সঙ্গে। এছাড়া দাবি ও প্রস্তাবের যা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব তা করার আশ্বাস দেন তিনি।

দেশে বর্তমানে অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বর্তমানে অন্তত ১৪ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে আছে, যা ইউজিসি থেকে পাঠানো হয়েছে।