জাতির যে ক্ষতি অপূরণীয়

235
জাতির যে ক্ষতি অপূরণীয়
জাতির যে ক্ষতি অপূরণীয়

“শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড!” আর করোনা মহামারীতে এই শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে তা কি পূরণ যোগ্য? মহামারী করোনা বিশ্বকে যে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে, সব কিছু কম বেশি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হলেও শিক্ষার এই ক্ষতি এখন অব্দি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি।

অতিমারীর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিশ্বে প্রায় ৬১ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশেও এই ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই উদ্বেগজনক। এখানেও প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ শিশু পড়াশোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাতির যে ক্ষতি অপূরণীয়

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, ‘দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি। আর মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। করোনায় এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ অন্য দিকে সেভ দ্য চিলড্রেন তাদের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, ‘মহামারীর কারণে বিশ্বে ৯৭ লাখ শিশুর হয়তো আর কোনোদিন ক্লাসে ফেরা হবে না…।’

প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী মার্চে। দু’বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের নিবিড় যোগাযোগ না থাকায় ক্লাসেও তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ফলে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার দিক থেকে তারা অনেক পিছিয়ে। একটি ক্লাস শেষ করে পরবর্তী ক্লাসে উঠতে হলে শিক্ষার যে কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে হয়, তা আর হয়ে উঠেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননে দুর্বলতার ছাপ রয়ে গেছে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০ বছর বয়সীদের ৭০ শতাংশই সহজ পাঠ্য পড়া বা বোঝার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ধারণা করা হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা স্বাভাবিক শিক্ষাবর্ষে যে পরিমাণ গণিত শিখতে পারত তার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিখেছে। শিক্ষায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। একে কাটিয়ে ওঠা এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি করা সম্ভব না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এর জন্য বড় ধরনের মাশুল গুণতে হবে; জাতি মেধাশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাবে।

জাতির যে ক্ষতি অপূরণীয়

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোয় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এই দুই বছরে অনেক কোমলমতি শিশু অ্যাকাডেমিক দক্ষতা অর্জন থেকে এমনভাবে পিছিয়ে পড়েছে, স্কুল পুরোদমে চালু হলেও তারা কতটা স্কুলে ফিরে আসতে আগ্রহী হবে তা রীতিমতো চিন্তার বিষয়। করোনা অতিমারীর কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে স্কুলগামী শিশুদের শিক্ষাবর্ষে যে অবস্থানে থাকার কথা তার চেয়ে ৭৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পিছিয়ে রয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ২০২১ সালের জুলাই মাস এর মধ্যবর্তী সময়ে সেখানে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য সেটি আরো মারাত্মক হতে পারে যা এখন চিন্তার কারণ।

কিন্তু এটি আমাদের পরিসংখ্যানে কতটা উঠে আসবে এ নিয়েও বেশ সংশয় রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান থাকলেও ঠিক কী কারণে তারা ঝরে পড়ছে সে খবর অনেকেই রাখেন না।

হয়তো শিগগিরই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে যাবে। মনে রাখতে হবে, স্কুল খোলা মানেই জটিল এই সমস্যার অবসান নয়। হয়তো এর সাথে আর নতুন কোনো ক্ষতি যোগ হবে না; কিন্তু পুরাতন ক্ষতিকে কাটিয়ে উঠতে হবে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোর অবসান ঘটাতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। তাদের বিদ্যালয়ে আসার জন্য আগ্রহী করে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের নিবিড় সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। দরকার হলে আর্থিক প্রণোদনাও দিতে হবে। কারণ এটি এখন প্রত্যন্ত গ্রাম ও শহরের স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজন। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে তারা যেন কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন না হয়। বাল্যবিয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তাদের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সিলেবাসের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে সমস্যা বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটি একটি কঠিন সময়। তাই শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। সেই সাথে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকার্যক্রম যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়।

করোনার দীর্ঘ স্থবিরতায় বেশির ভাগ শিশুই গণনাসহ সাক্ষরতার মৌলিক দক্ষতা হারিয়েছে। এ জন্য তারা কিন্তু দায়ী নয়; বরং পরিবেশ পরিস্থিতি তাদের এ অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের অবশ্যই নমনীয় ও সহিষ্ণু আচরণ করতে হবে যেন তারা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। লাখ লাখ শিশু শ্রেণিকক্ষে থাকলে যে অ্যাকাডেমিক শিক্ষা তারা অর্জন করতে পারত তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে। তারা উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়েছে।

জাতির যে ক্ষতি অপূরণীয়

দীর্ঘ দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এখন তারা অধিক পরিমাণে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় ভুগছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এটি আরো প্রবল আকার ধারণ করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে আর্থিক সঙ্কট। এই সমস্যার সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে মেয়েশিশু ও শিশু-কিশোরীরা। তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের অপুষ্টিতে ভোগার আরো একটি বড় কারণ হলো – ফুড নিউট্রিশনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের যে খাবার সরবরাহ করা হতো তা করোনার কারণে তা বন্ধ ছিল। অন্য দিকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখার জন্য তাদের যে পরিবেশ প্রয়োজন ছিল সেটিও ছিল না।

পিছিয়ে পড়া এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সব দিক ভাবতে হবে। আর শ্রেণিকার্যক্রমের ওপর অধিক মাত্রায় জোর দিতে হবে। একজন শিক্ষককে সবসময় শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক হতে হবে। মমত্ব ও ভালোবাসা দিয়ে তারা যদি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ধরে রাখতে না পারেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় তাদের ঝরে পড়ার গতি ক্রমাগত আরো বাড়তে থাকবে। এখনই সময় এর লাগাম টেনে ধরার।