গোবিন্দগঞ্জে করোনার বাধা পেরিয়ে বাহা উৎসবে মাতলো সাঁওতালরা

90

গাইবান্ধা প্রতিনিধি : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যে নাচ-গানে বরণ করলেন ঋতুরাজ বসন্তকে। করোনার বাধা পেরিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি বাহা পরবে মাতলো গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লী।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামদিয়া ইউনিয়নের তল্লাপাড়া গ্রামে সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট প্রি সেমিনারী স্কুল প্রাঙ্গণে গতকাল বুধবার মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ও অবলম্বনের আয়োজনে বাহা পরব বা বসন্ত উৎসব উদ্্যাপন করলো সাঁওতালরা। নাচে-গানে আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে আদিবাসী সাঁওতালরা তাদের নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতিতে বাহা পরবের মাধ্যমে বরণ করেন ঋতুরাজ বসন্তকে।

দিনভর ধর্মীয় পুজা-অর্চনা ও সাঁওতাল সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনায় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক সাঁওতাল নারী-পুরুষ-কিশোরী অংশ নেন। বিভিন্ন সাঁওতাল-বাঙালিদের আগমনে মিলন মেলায় পরিণত হয় গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল অঞ্চল। পরে স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীদের পাশাপাশি আমন্ত্রিত সাঁওতাল সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করেন। এতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ৬টি ইউনিয়নের ৭টি সংস্কৃতিক দল অংশগ্রহণ করে।

বাহা পরব উদ্্যাপন কমিটি আহবায়ক শ্যামলী কিস্কুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহবায়ক অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু ও সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভুমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাসকে। অন্যান্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন ইউপি সদস্য মজিদা বেগম, বাজিতপুর মিশনের কোষাধ্যক্ষ মাইকেল হেমব্রম, আদিবাসী বাঙালী পরিষদের গোলাম রব্বানী মুসা, জাহাঙ্গীর কবির প্রমুখ।

আলোচকরা, সাঁওতালদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ও সামজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। সাঁওতালসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় তাদের নিজস্ব ভাষা শিক্ষা দান ও কালচারাল একাডেমি স্থাপন করার দাবি জানান। সাঁওতালরা আমাদের এ’দেশেরই নাগরিক, তাদের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য এ’দেশের সংস্কৃতিরই অংশ। বসন্ত ঋতু আসলেই গাছে গাছে নতুন ফুলের সমারোহ প্রকৃতি প্রিয় মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। শিমুল, পলাশে শোভায় প্রকৃতি নিজেকে নতুন রূপে প্রকাশ করে। আদিবাসী সাঁওতালরাও বসন্তকে বরণ করে নেয় তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য দিয়ে। এসময় সাঁওতাল তরুণীরা নতুন নতুন ফুল তাদেও খোঁপায় গেঁথে আনন্দে নাচে-গানে মেতে ওঠে। সাঁওতাল গ্রামে গ্রামে চলে আনন্দ উৎসব। বাড়ি বাড়ি তৈরি হয় হাঁড়িয়া। সবাই হাঁড়িয়া খেয়ে আনন্দে বিভোর হয়ে মাদলের তালে তালে গাইতে থাকে, নাচতে থাকে। আর সেই আনন্দ-উৎসবের নাম ‘‘বাহা পরব’’।

আদিবাসী সাঁওতালদের অন্যতম একটি প্রধান পার্বণ হচ্ছে ‘‘বাহা উৎসব’’ বা বাহা পরব। বাহা অর্থ ফুল। তাই বাংলায় বাহা পরবকে ‘‘ফুল উৎসব’’ বলা হয়। মূলত, নববর্ষ হিসেবে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালন করে সমতলে বসবাসকারী আদিবাসী-সাঁওতালরা। উত্তরাঞ্চলে সমতলে বসবাসকারী আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে উড়াও, মুন্ডা, মালো, মাহাতো, মালপাহাড়ী, রাজওয়ারসীসহ মোট ৩৮টি ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী এই বাহা উৎসব পালন করে থাকে।

বাহা পরব উদ্্যাপন কমিটি আহবায়ক শ্যামলী কিস্কু বলেন, প্রাণ-প্রকৃতিকে ভালোবেসে সাঁওতাল বাহা উৎসব পালন করি। এই বাহা উৎসবের পুজা পার্বন করলে আমাদের সমাজ ও পরিবারের উন্নয়ন হবে। বাহা পুজা না করা পর্যন্ত সাঁওতাল নারীরা বাহা ফুল অর্থাৎ শাল ফুল ছিড়েও না মাথায় পরেও না। নতুন প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে শিখবে ও দেখবে এবং যাতে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী বাহা পরব নষ্ট না হয়।