কাম-বাসনা ত্যাগ করে ইতিকাফে মিলতে পারে অমূল্য রতন

250
পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের নাম ইতিকাফ। মানবজীবনের শুদ্ধতার জন্য ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম। ইতিকাফ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাওয়া যায়। তাই সবার উচিত যথা নিয়মে ইতিকাফ করা।
পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের নাম ইতিকাফ। মানবজীবনের শুদ্ধতার জন্য ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম। ইতিকাফ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাওয়া যায়। তাই সবার উচিত যথা নিয়মে ইতিকাফ করা।

পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের নাম ইতিকাফ। মানবজীবনের শুদ্ধতার জন্য ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম। ইতিকাফ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাওয়া যায়। তাই সবার উচিত যথা নিয়মে ইতিকাফ করা।

রাসূল (সা.) পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। তিনি মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ইবাদত-বন্দেগীর মধ্য দিয়ে একান্তে সময় কাটাতেন।

ইতিকাফ করার সময় রাসুল (সা.) স্ত্রী সংস্পর্শ বা সহবাস বর্জন করতেন, জানাজায় অংশ নিতেন না, এমনকি কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দর্শনে যেতেন না। এ বিষয়ে আয়েশা (রা.) বলেন, ইতিকাফকারীর সুন্নত হচ্ছে অসুস্থের দর্শনে গমন না করা, জানাজায় অংশ না নেওয়া, নারী সংসর্গ ও সহবাস বর্জন করা এবং অত্যাবশ্যকীয় কোনো প্রয়োজন ব্যতীত ইতিকাফ হতে বের না হওয়া। (আবু দাউদ : ২৪৭৩)।

রাসুল (সা.) অত্যাবশ্যকীয় কোনো কারণ ছাড়া ইতিকাফ থেকে বের হতেন না। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইতিকাফরত অবস্থায় কোনো কারণ ব্যতীত গৃহে প্রবেশ করতেন না। (বুখারি: ২০২৯)

ইতিকাফ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, আমি কদরের রাতের তালাশে প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে, তা শেষ দশ দিনে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ পছন্দ করে সে যেন ইতিকাফে বসে। (মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১৯৯৪)।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, মহানবী রাসূল (সা.) রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৭১)

রমজান মাসের শেষ দশ দিনে ইতিকাফ করার অন্যতম কারণ ছিল- এই সময়ে মহানবী লাইলাতুল কদরের খোঁজ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। তিনি বলতেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২০)

মহানবী ইবাদতের জন্য মসজিদের একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে নিতেন। সেখানে তিনি নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকিরসহ সব ধরনের ইবাদতে মশগুল হতেন। প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। শুধু তাই নয়, প্রয়োজন ছাড়া কোনো স্ত্রীর ঘরেই প্রবেশ করতেন না। কারণ ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে মিলিত হওয়া জায়েজ নয়। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না। (সূরা বাকারাহ : আয়াত ১৮৭)।

মহানবী রমজান মাসে কেবল নিজেই নিয়মিতভাবে ইতিকাফ করতেন না, তার সাহাবি ও স্ত্রীদেরও ইতিকাফ করার আহ্বান জানাতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমৃত্যু রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করেছেন। তার মৃত্যুর পর স্ত্রীরাও ইতিকাফ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২৬)

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আয়েশা (রা.) বলেছেন, তিনি ঋতুবতী অবস্থায়ও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর চুল আঁচড়ে দিতেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে তার (আয়েশার) ঘরের দিকে মাথাটা বাড়িয়ে দিতেন। তখন তিনি (আয়েশা) মাথার চুল আঁচড়ে দিতেন। অথচ তিনি ছিলেন ঋতুবতী। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৬)

ইতিকাফের ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। প্রতিটি খন্দক আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরবর্তী হবে।

ইতিকাফ আরবি শব্দ। এর অর্থ স্থির থাকা বা অবস্থান করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে বা ঘরের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করা বা স্থিতিশীল থাকাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া।

রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করা সুন্নত। কোনো জনপদের কেউ ইতিকাফ করলে বাকিদের ওপর থেকে এর দায় ঘুঁচে যায়। কিন্তু কেোনা জনপদের কেউই যদি ইতিকাফ না করে তাহলে সকলেই সুন্নতে মুয়াক্কাদা বর্জনের দায়ে দায়ী হবেন।

রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকেই ইতিকাফ শুরু করতে হয় এবং ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা না যাওয়া পর্যন্ত ইতিকাফ অবস্থায় থাকতে হয়।

ইতিকাফের কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন- ইতিকাফের নিয়ত করতে হবে। পুরুষদের এমন মসজিদে ইতিকাফ করতে হবে যেখানে নামাজের জামাত হয়। আর নারীরা ঘরের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে ইতিকাফ করবে। ইতিকাফ করা অবস্থায় ঋতুস্রাব কিংবা প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ শুরু হলে ইতিকাফ ছেড়ে দিতে হবে।

ইতিকাফ অবস্থায় দুনিয়াদারির চিন্তা-ভাবনা ও অপ্রয়োজনীয় কথা-বার্তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিটি মহূর্ত আল্লাহকে স্মরণে রেখে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতে হবে। দৈনন্দিন প্রাকৃতিক কাজ যেমন- প্রস্রাব-পায়খানা, অজু-গোসল, ঘুম ইত্যাদি সবই করা যাবে। তবে সবকিছুই নিয়মের মধ্যে থেকে আদায় করলে পরিপূর্ণ ইতিকাফের সওয়াব পাওয়া যাবে।

আর‌বি বা‌রো মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস রমজান। কারণ এই মাসে আ‌ছে এমন একটি ম‌হিমা‌ন্বিত রাত যা হাজার মাসের চে‌য়ে শ্রেষ্ঠ। প‌বিত্র এই রজনী‌কে বলা হয় লাইলাতুল কদর। পরম মহিমান্বিত ও সম্মানিত এই রাতেই পবিত্র কোরআন না‌জিল হ‌য়ে‌ছে।

এ বিষ‌য়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আমি তা অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রতিটি কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তি বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল-কদর, আয়াত: ১-৫)

লাইলাতুল কদরের অ‌নেক ফজিলত রয়েছে। এই রা‌ত ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটানোর সুযোগ পাওয়া অ‌নেক সৌভা‌গ্যের এক‌টি বিষয়। ত‌বে রাতটি পাওয়া মো‌টেও সহজ নয়। কারণ কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তা নির্দিষ্ট করা হয়‌নি, বরং গোপন রাখা হয়েছে। হতে পারে রাতটি রমজানের ২৭তম রাত। আবার হতে পারে রমজানের শেষ ১০ দিনের মধ্যে বেজোড় কো‌নো রাত (‌যেমন- ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ‌কিংবা ২৯ রমজা‌নের রাত)।

আবার বাংলাদেশে যেদিন ২১ তারিখ সে‌দিন পশ্চিমা কোনো দেশে হয়‌তো ২২ তারিখ। কিন্তু পু‌রো বি‌শ্বে পৃথিবীতে লাইলাতুল কদর একটি রাতেই হয়। কা‌জেই রমজানের শেষ দশ দি‌নের জোড় বা বিজোড়- সব রাতেই যদি কেউ লাইলাতুল কদর খোঁজার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর ইবাদত করতে চান তাহ‌লে ইতিকাফ হ‌তে পা‌রে দারুণ এক‌টি পন্থা।

লাইলাতুল কদরের ফজিলত অ‌নেক বেশি। কেউ এই একটি রাত ইবাদত করলেই হাজার মাসের চেয়েও বেশি ইবাদত করার সমান সওয়াব পে‌য়ে যা‌বেন। আবার কেউ যদি ম‌হিমা‌ন্বিত এই রাতে এক টাকা দান করেন তবে তি‌নি হাজার মাসের চেয়েও বেশি সময় ধ‌রে প্রতিদিন এক টাকা করে দান করলে যে সওয়াব পে‌তেন সেই সওয়াব পে‌য়ে যা‌বেন।